---Advertisement---

ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির চুক্তি কি আদৌ হবে? এত অবিশ্বাস কেন?

April 23, 2026 6:05 AM
ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি: পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সমঝোতা
---Advertisement---

ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চললেও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক চুক্তির পথ এখনো কণ্টকাকীর্ণ। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে একটানা ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরেও কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ১৪ দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে, অথচ দুই পক্ষের অনড় অবস্থান পুরো প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য শুধু পারমাণবিক ইউরেনিয়াম বা হরমুজ প্রণালি নিয়ে নয় — সমস্যার শিকড় আরও গভীরে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পূর্ণ অভাব। কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক করিম সাদজাদপুর স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগে যে সামান্য বিশ্বাস ছিল — এখন তাও নেই।

ট্রাম্পকে কেন বিশ্বাস করে না ইরান?

ইরানের কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে ‘মূল বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে দেখেন — এবং এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের আমলে প্রায় ২০ মাসের দীর্ঘ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইইউ-সহ ইরানের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সবাই একমত ছিল যে ইরান ওই চুক্তি মেনে চলছিল। তারপরও ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে সেই চুক্তিকে ‘বিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে বের হয়ে যান।

ট্রাম্প কখনো দাবি করেননি যে ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। চুক্তিটা তাঁর পছন্দ হয়নি — এটুকুই কারণ। এরপর থেকে তেহরানের কাছে যেকোনো মার্কিন প্রতিশ্রুতি মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে যখন ইরানের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তির চেষ্টা হয়, তখন ইরানের নেতারা এই নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় এলে এই চুক্তিও বাতিল হবে না। স্বাভাবিকভাবেই, সে নিশ্চয়তা দেওয়ার কোনো উপায় ছিল না।

🔥 আলোচনার মাঝেই হামলা — আস্থা ভাঙার সবচেয়ে বড় ঘটনা

এই অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে একটি নির্দিষ্ট ঘটনায়। গত ফেব্রুয়ারির শেষে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় মার্কিন প্রতিনিধিরা ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু সেই বৈঠকের মাত্র একদিন পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে বোমাবর্ষণ চলে। মার্কিন কর্মকর্তারা নিজেই স্বীকার করেছেন, জেনেভা বৈঠকের আগেই যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

আরো পড়ুন: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক হামলা করলে পরিণতি কী হবে?

এই ঘটনার পর ইরানের কাছে বার্তা স্পষ্ট হয়ে যায় — আলোচনার টেবিলে বসে থাকলেও পিঠে ছুরি মারা হতে পারে। কার্নেগি গবেষক করিম সাদজাদপুর বলেন, ইরান এখন এই বিশ্বাস নিয়ে চলছে যে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারে — এমনকি আলোচনার মধ্যেও। ট্রাম্প এটা আগে দুইবার করেছেন।

অবিশ্বাস কিন্তু দুই দিকেই আছে

⚖️ শুধু ইরান নয়, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানকে বিশ্বাস করে না। ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, ইরান দশকের পর দশক ধরে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শুধু শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যের বলে দাবি করে আসছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (IAEA) অসম্পূর্ণ ও মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। মাটির নিচে গোপন পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে ইরান আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে বলেও অভিযোগ করে যুক্তরাষ্ট্র।

বুশ প্রশাসনের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মাইকেল ডোরান বলেন, দশকের পর দশক ধরে পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে প্রতারণা করে আসার কারণে ইরানের দেওয়া যেকোনো আশ্বাসের উপর আস্থা রাখার যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

চুক্তির পথে যে ৫টি বড় বাধা

বর্তমানে দুই পক্ষের আলোচনা মূলত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আটকে আছে:

বিষয়যুক্তরাষ্ট্রের দাবিইরানের অবস্থান
পারমাণবিক কর্মসূচিচিরতরে বা ২০ বছরের জন্য বন্ধসর্বোচ্চ ৫ বছর স্থগিত
ইউরেনিয়াম মজুদ৪০০ কেজির বেশি হস্তান্তরদর-কষাকষি চলছে
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণআলোচনা নেই২৭০ বিলিয়ন ডলার দাবি
নিষেধাজ্ঞাশর্তসাপেক্ষে প্রত্যাহারঅবিলম্বে প্রত্যাহার চাই
হরমুজ প্রণালিউন্মুক্ত রাখতে হবেঅবরোধের হুমকি বহাল

এই পাঁচটি বিষয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের পার্থক্য বিশাল। ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার আলোচনায় কূটনৈতিক সূত্র জানায়, আলোচনা প্রায় ৮০ শতাংশ এগিয়েছিল — কিন্তু শেষ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় বৈঠক ব্যর্থ হয়।

চুক্তি কি আদৌ সম্ভব?

ওবামা ও বাইডেন আমলে ইরানের সঙ্গে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী রবার্ট ম্যালি বলেন, এই চুক্তি বেশ জটিল। কারণ ইরানের কাছ থেকে যেসব ছাড় চাওয়া হচ্ছে — যেমন উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর বা পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কমানো — সেগুলো বাস্তবধর্মী ও একবার দিলে ফেরত পাওয়া কঠিন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ছাড়গুলো — যেমন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া — তাত্ত্বিক ও পরিবর্তনযোগ্য। পরের প্রেসিডেন্ট চাইলে এই ছাড়গুলো যেকোনো সময় বাতিল করতে পারেন।

তাই ইরান চাইছে ধাপে ধাপে এগোতে — আগে দেখুক যুক্তরাষ্ট্র কথা রাখছে কিনা, তারপর পরবর্তী পদক্ষেপ। কিন্তু ট্রাম্প ধৈর্যশীল নেতা হিসেবে পরিচিত নন। এই ধীরগতির পদ্ধতি তিনি মানতে নারাজ হতে পারেন।

আরো পড়ুন: ব্যর্থ আলোচনার পর উপযুক্ত সময়ে ইরানকে খতম করার হুমকি দিলেন ট্রাম্প

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই অবশ্য জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে প্রথম দফা বৈঠক ব্যর্থ হলেও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এখনো চলছে।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভাঞ্চি বিবিসিকে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে কথা বলতে রাজি থাকে — তাহলে ইরানও চুক্তির পথে এগোতে প্রস্তুত। সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব এখন ওয়াশিংটনের।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

করিম সাদজাদপুর মনে করেন, দুই দেশের অবিশ্বাসের গভীরতা এবং আলোচনার বিষয়বস্তুর সংবেদনশীলতার কারণে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বড় মাপের কোনো চুক্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি করতেই লেগেছিল প্রায় ২০ মাস এবং ছয়টি বিশ্বশক্তির অংশগ্রহণ। এবারের প্রেক্ষাপট আরও জটিল — কারণ যুদ্ধের ক্ষত তাজা, এবং আস্থার ঘাটতি আগের চেয়ে অনেক বেশি।

রোনাল্ড রিগ্যানের বিখ্যাত উক্তি ছিল, “বিশ্বাস করো, তবে যাচাই করে নাও।” কিন্তু এই মুহূর্তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র — কোনো পক্ষই সেই মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম কিনা, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। 🌍

শেষ কথা: ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি

ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চললেও স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথ এখনো অনিশ্চিত। দুই দশকের বেশি সময় ধরে জমে থাকা অবিশ্বাস, চুক্তি ভেঙে দেওয়ার ইতিহাস এবং যুদ্ধের মাঝেও কূটনীতির নামে প্রতারণার অভিযোগ — সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত সংকটজনক।

ইরান ধাপে ধাপে এগোতে চাইছে, আর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সিদ্ধান্ত চাইছে — এই বিপরীত গতি নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে দুই পক্ষ।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দরকার পারস্পরিক ছোট ছোট বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ — যা একবারে না হলেও ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করতে পারবে। এই বিষয়ে আরও আপডেট জানতে jugeralo.com বুকমার্ক করে রাখুন এবং বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন।

Disclaimer: এই নিবন্ধটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি। এতে প্রকাশিত মতামত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সংস্থার নিজস্ব। jugeralo.com কোনো পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করে না।

Juger Alo Facebook Pageযুগের আলো’র সর্বশেষ খবর পেতে Facbook Page অনুসরণ করুন

Juger Alo

যুগের আলো — নতুন তথ্যের নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। আমরা শিক্ষা, ক্যারিয়ার, সর্বশেষ প্রযুক্তি এবং সমসাময়িক খবরের সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ আপডেট পৌঁছে দিই সবার আগে। সঠিক তথ্যে নিজেকে আপডেট রাখতে আমাদের সাথেই থাকুন।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now