পৃথিবীর শুরু ও শেষ কোথায় — এই প্রশ্নটি হয়তো একসময় আপনার মাথায় এসেছে। পৃথিবী গোল, তাই ভৌগোলিকভাবে কোনো “শুরু” বা “শেষ” নেই। কিন্তু মানুষের বসতির একটি সীমানা আছে। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে যত এগোনো যায়, মানুষের অস্তিত্ব তত কমে আসে — একসময় শুধু বরফ আর অন্ধকার।
সেই শেষ সীমানার শহরগুলোতে মানুষ কীভাবে টিকে থাকে? কোথায় মাসের পর মাস সূর্য ওঠে না, কোথায় মেরু ভালুকের ভয়ে বন্দুক ছাড়া বাইরে বেরোনো যায় না — এই অদ্ভুত জীবনযাপনের গল্প অনেকেরই অজানা।
এই প্রতিবেদনে আমরা জানব পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণের শহর এবং সবচেয়ে উত্তরের শহর — দুটির অবস্থান, ইতিহাস ও সেখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে। 🌍
আরো পড়ুন: শিশুকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়তে যে ২৫টি সামাজিক নিয়ম অবশ্যই শেখাবেন
পৃথিবীর শেষ প্রান্তে কী আছে — দক্ষিণ গোলার্ধের চিত্র
মানচিত্রে ৪৫ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশের নিচে তাকালে চোখে পড়বে বিস্তীর্ণ সমুদ্র। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, চিলি, আর্জেন্টিনা ও নিউজিল্যান্ডের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তটুকু বাদে মানুষের বসতি নেই বললেই চলে। এই অঞ্চলে তীব্র শীত, প্রবল বাতাস ও অনিয়মিত আলো মানুষের বসবাসকে প্রতিনিয়ত কঠিন করে তোলে।
পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্তে মানুষ কোথায় থাকে — এই প্রশ্নের উত্তরে তিনটি শহরের নাম বারবার উঠে আসে।
তিন শহরের লড়াই: কোনটি সত্যিই সবচেয়ে দক্ষিণে?
| শহর | দেশ | অক্ষাংশ (প্রায়) | জনসংখ্যা |
|---|---|---|---|
| পুয়ের্তো উইলিয়ামস | চিলি | ৫৪.৯° দক্ষিণ | ~২,০০০ |
| উশুইয়া | আর্জেন্টিনা | ৫৪.৮° দক্ষিণ | ~৮৩,০০০ |
| পুন্তা আরেনাস | চিলি | ৫৩.২° দক্ষিণ | ~১,২০,০০০ |
চিলির পুয়ের্তো উইলিয়ামস ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে দক্ষিণে হলেও এর মাত্র দুই হাজার বাসিন্দা থাকায় অনেকে একে পূর্ণাঙ্গ শহর হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। পুন্তা আরেনাস অনেক বড়, কিন্তু সেটি পুয়ের্তো উইলিয়ামস থেকে ২০০ কিলোমিটার উত্তরে। তাই সব দিক বিচারে আর্জেন্টিনার উশুইয়াই “পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণের শহর” হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।
আরো পড়ুন: ১৪৩ মানে কি? কেউ পাঠালে কী বুঝবেন — এর পেছনের গল্প জানেন কি?
উশুইয়া: পৃথিবীর শেষ প্রান্তের শহর 🏔️
আর্জেন্টিনার টিয়েরা দেল ফুয়েগো প্রদেশের এই শহরটিকে স্থানীয়রা ডাকেন “ফিন দেল মুন্দো” — স্প্যানিশে যার অর্থ “পৃথিবীর শেষ প্রান্ত”। প্রায় ৮৩ হাজার মানুষের এই শহরে রয়েছে পাকা রাস্তা, আধুনিক হাসপাতাল, বিমানবন্দর ও বন্দর।
আরো পড়ুন
উশুইয়ায় কেন যান মানুষ?
উশুইয়া কেবল শেষ প্রান্তের শহর নয়, এটি অ্যান্টার্কটিকা অভিযানের প্রধান ঘাঁটিও। যাঁরা দক্ষিণ মেরু মহাদেশে বেড়াতে যান, তাঁদের জাহাজ এই বন্দর থেকেই ছাড়ে। পর্যটনই এখানকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
- বরফঢাকা পাহাড় ও মনোরম ফিওর্ড দৃশ্য
- পেঙ্গুইন কলোনি দেখার সুযোগ
- Tierra del Fuego জাতীয় উদ্যানে হাইকিং
- বিশ্বের দক্ষিণতম রেলপথে ভ্রমণ
এখানকার আবহাওয়া সারা বছরই বেশ ঠান্ডা। গ্রীষ্মে (ডিসেম্বর–ফেব্রুয়ারি) তাপমাত্রা ৯–১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। শীতে নামে শূন্যের কাছাকাছি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীর শেষ প্রান্তে হওয়া সত্ত্বেও এই শহর বেশ সরগরম ও জীবন্ত।
উত্তরে যেতে হলে আরও দূর যেতে হয়
এখন একটু ভূগোল বোঝা দরকার। উশুইয়া যে অক্ষাংশে আছে, ঠিক সেই একই অক্ষাংশে উত্তর গোলার্ধে থাকলে আপনি পৌঁছাবেন ইংল্যান্ডের কোনো শহরে! কারণ উত্তর গোলার্ধে স্থলভাগ অনেক বেশি এবং সমুদ্রের উষ্ণ স্রোত (যেমন গালফ স্ট্রিম) সেখানকার আবহাওয়াকে অনেক বেশি বাসযোগ্য করে তোলে।
তাই পৃথিবীর শেষ প্রান্তে কী আছে তা উত্তর দিক থেকে দেখতে হলে ৭০ ডিগ্রি অক্ষাংশ পেরিয়ে আরও উপরে যেতে হবে।
লংইয়ারবাইন: অদ্ভুত নিয়মের শহর
নরওয়ের স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত লংইয়ারবাইন পৃথিবীর অন্যতম উত্তরের বসতি। প্রায় ২,৮০০ মানুষের এই জায়গায় কিছু নিয়ম আছে যা শুনলে অবাক লাগবে।
- মানুষের চেয়ে মেরু ভালুকের সংখ্যা বেশি — তাই শহরের বাইরে বন্দুক বহন বাধ্যতামূলক
- কেউ মারা গেলে এখানে কবর দেওয়া নিষিদ্ধ — তীব্র ঠান্ডায় মৃতদেহ পচে না, তাই মৃতদেহ অন্য স্থানে পাঠাতে হয়
- শহরে একটি বৈশ্বিক বীজ ভান্ডার (Global Seed Vault) রয়েছে, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন ফসলের বীজ সংরক্ষিত আছে
তবে লংইয়ারবাইন পুরোপুরি একটি স্বীকৃত স্বায়ত্তশাসিত শহর নয়, তাই এটি আনুষ্ঠানিক খেতাব পায় না।
আরো পড়ুন: এই ৫টি বিনিয়োগ না করলে আপনি সারাজীবন মধ্যবিত্ত থেকে যাবেন – সতর্কবার্তা
উটকিয়াগভিক: পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের স্বীকৃত শহর 🌑
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত উটকিয়াগভিক (পুরোনো নাম: ব্যারো) হলো আইনগতভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের স্বীকৃত পৌরসভা। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের এই শহরটি আর্কটিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত।
রাত ও দিনের অদ্ভুত খেলা
উটকিয়াগভিকের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের নিয়ম:
- পোলার নাইট: নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত টানা প্রায় ৬৫ দিন সূর্য ওঠে না। পুরো শহর অন্ধকারে ডুবে থাকে।
- মিডনাইট সান: মে থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত টানা আড়াই মাস সূর্য অস্ত যায় না। মাঝরাতেও আলো থাকে।
এই পরিবেশে হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছেন ইনুপিয়াত আদিবাসী সম্প্রদায়। তাঁরা ঐতিহ্যগতভাবে তিমি শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখনও সেই সংস্কৃতি অনেকটাই জীবন্ত।
উটকিয়াগভিকে জীবনযাত্রা কেমন?
এখানে রাস্তায় গাড়ি চলে, কিন্তু শহরের বাইরে কোনো রাস্তা নেই। একমাত্র যোগাযোগ হয় বিমান বা শীতকালে জমাট বরফের ওপর দিয়ে। তাপমাত্রা শীতকালে মাইনাস ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামে। বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গে বায়ু যোগ করলে অনুভূত তাপমাত্রা আরও অনেক কম।
তবুও মানুষ এখানে আছে। স্কুল আছে, হাসপাতাল আছে, এমনকি ইন্টারনেট সংযোগও আছে।
আমেরিকা মহাদেশেই দুই প্রান্ত
একটি অসাধারণ কাকতালীয় ঘটনা হলো — পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণের শহর উশুইয়া (আর্জেন্টিনা) এবং সবচেয়ে উত্তরের শহর উটকিয়াগভিক (আলাস্কা, যুক্তরাষ্ট্র) — দুটোই আমেরিকা মহাদেশে অবস্থিত।
তাত্ত্বিকভাবে প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে ধরে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া সম্ভব — যদি পানামা ও কলম্বিয়ার মধ্যে ডেরিয়েন গ্যাপের সংযোগ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়।
আরো পড়ুন: সঞ্চয়পত্র মুনাফার হার ২০২৬: কেন এখনো ব্যাংকের চেয়ে বেশি লাভজনক ও নিরাপদ?
আপনাদের প্রশ্ন, আমাদের উত্তর: (FAQ)
১. পৃথিবীর শেষ প্রান্ত কোন দেশে অবস্থিত?
ভৌগোলিক দিক থেকে নরওয়ের উত্তর দিকে অবস্থিত ‘স্যালবার্ড’ (Svalbard) দ্বীপপুঞ্জকে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত বা উত্তরতম জনপদ ধরা হয়।
২. ২০১২ সালকে পৃথিবীর শেষ বলা হতো কেন?
প্রাচীন ‘মায়া ক্যালেন্ডার’-এর একটি চক্র ২০১২ সালের ২১শে ডিসেম্বর শেষ হয়েছিল। সেখান থেকেই বিশ্বজুড়ে গুজব ছড়িয়েছিল যে ওই দিনই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।
৩. পৃথিবীর সর্বশেষ কোন স্থানে দিন শেষ হয়?
প্রশান্ত মহাসাগরের আমেরিকান সামোয়া (American Samoa) দ্বীপে সবশেষে দিন শেষ হয় এবং নতুন দিন শুরু হওয়ার ঠিক আগে এটিই শেষ স্থান।
৪. পৃথিবীর শেষ রাস্তা কোথায়?
নরওয়ের ‘ই-সিক্সটি নাইন’ (E69) হাইওয়েকে পৃথিবীর শেষ রাস্তা বলা হয়। এটি উত্তর মেরুর দিকে যাওয়ার শেষ সড়ক, এরপর আর কোনো রাস্তা নেই।
৫. পৃথিবীতে জীবন কি শেষ হয়ে যাবে?
বৈজ্ঞানিক মতে, সূর্যের লোহিত দানব দশায় রূপান্তরের ফলে একসময় পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব অসম্ভব হয়ে পড়বে। তবে তা হতে আরও কোটি কোটি বছর বাকি।
৬. কোন দেশে দিনে মাত্র ৪০ মিনিট রাত থাকে?
নরওয়ের হ্যামারফেস্ট (Hammerfest) শহরে গ্রীষ্মকালে সূর্য দিগন্তের নিচে পুরোপুরি যায় না, ফলে সেখানে অন্ধকার থাকে মাত্র ৪০ মিনিটের মতো।
৭. নিশীথ সূর্যের দেশ কোনটি?
নরওয়েকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বলা হয়, কারণ গ্রীষ্মকালে এখানে দিগন্তরেখায় মাঝরাতেও সূর্য দেখা যায়।
৮. জান্নাতে রাত নেই কেন?
ইসলামিক আকিদা অনুযায়ী, জান্নাত হবে চিরস্থায়ী আলোর জায়গা এবং সেখানে ক্লান্তি বা ঘুমের প্রয়োজন নেই বলে রাত থাকবে না।
৯. ২০৫০ সালে পৃথিবীতে কী ঘটবে?
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে এবং অনেক নিচু দেশ চরম পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
১০. ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর কী হবে?
জাতিসংঘের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন (SDG) নিশ্চিত করার কথা, তবে কার্বন নিঃসরণ না কমলে তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার ঝুঁকি রয়েছে।
১১. পরের দিন প্রথম শুরু হয় কোন দেশে?
আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা অনুযায়ী দ্বীপ রাষ্ট্র কিরিবাতি (Kiribati)-তে পৃথিবীর নতুন দিন প্রথম শুরু হয়।
১২. মানুষের আগে পৃথিবী কেমন ছিল?
মানুষের আগে পৃথিবীতে অতিকায় সরীসৃপ (ডাইনোসর), ঘন জঙ্গল এবং বিশাল সব স্তন্যপায়ী প্রাণীর রাজত্ব ছিল। অক্সিজেন ও কার্বনের মাত্রা ছিল বর্তমানের চেয়ে ভিন্ন।
১৩. পৃথিবীর প্রথম প্রাণ কে ছিলেন?
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে সমুদ্রের তলদেশে এককোষী ব্যাকটেরিয়া বা ‘প্রোক্যারিওটস’ ছিল পৃথিবীর প্রথম প্রাণের রূপ।
আরো পড়ুন: কুয়াশা কি ও শীতকালে কেন হয়? কুয়াশা পড়লে ঠান্ডা বাড়ে নাকি কমে? জেনে নিন যা ৯০% মানুষ জানে না
শেষ কথা: পৃথিবীর শুরু ও শেষ কোথায়?
পৃথিবীর শুরু ও শেষ কোথায় — এই প্রশ্নের উত্তর এখন নিশ্চয়ই অনেকটা পরিষ্কার। দক্ষিণে আর্জেন্টিনার উশুইয়া আর উত্তরে আলাস্কার উটকিয়াগভিক — এই দুই শেষ প্রান্তের মানুষেরা প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন পরিবেশে জীবন গড়ে নিয়েছেন। তাঁদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা আসলে কতটা অসাধারণ।
যদি এই প্রতিবেদনটি আপনার কাছে তথ্যবহুল মনে হয়, তাহলে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন। পৃথিবীর আরও অজানা জায়গার গল্প জানতে চাইলে jugeralo.com বুকমার্ক করে রাখুন — প্রতিদিন নতুন তথ্য নিয়ে আমরা হাজির থাকি।
বিশ্বের আরও চমকপ্রদ ভৌগোলিক রহস্য ও ভ্রমণ বিষয়ক তথ্য পেতে আমাদের [ট্রাভেল ও ভূগোল বিভাগ] ভিজিট করতে পারেন। 🌐
Disclaimer: দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত জনসংখ্যার তথ্য সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে এবং সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। ভ্রমণ পরিকল্পনার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস বা অফিসিয়াল পর্যটন সংস্থার তথ্য যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।












