বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সরকার জরুরি হামের টিকা কর্মসূচি শুরু করেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দেশের ২০ জেলার ৩০টি এলাকাকে ‘হটস্পট’ বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এসব এলাকায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
রোববার (৫ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব শিশু আগেই নিয়মিত কর্মসূচিতে হামের টিকা নিয়েছে তারাও এই বিশেষ টিকা নিতে পারবে। এতে কোনো অতিরিক্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ দিনে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ১০৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ৫,৮১২ শিশু। বর্তমানে প্রায় ৯৪৭ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হামের বর্তমান পরিস্থিতি ও উদ্বেগের কারণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ দিনে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ১০৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ৫,৮১২ জন শিশু। বর্তমানে প্রায় ৯৪৭ জন শিশু দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অনেকের শরীরেই হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আরো বিস্তারিত জানতে এখানে দেখুন: হঠাৎ দেশজুড়ে শিশুদের হামের প্রকোপ: বাড়ছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক; প্রতিকারের উপায় কী?
দেশে হামের প্রকোপ কেন বাড়ছে?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণে দেশে হঠাৎ করে হামের সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে টিকাদান কভারেজের ঘাটতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংক্রমণ বাড়ার প্রধান কারণগুলো হলো:
- কোভিড মহামারির পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটা।
- শহরের বস্তি ও সুবিধাবঞ্চিত দুর্গম এলাকাগুলোতে টিকাদানে বড় ধরণের ঘাটতি।
- শিশুদের মধ্যে অপুষ্টিজনিত সমস্যা ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
- এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মানুষের স্থানান্তরের (Migration) কারণে অনেক শিশু টিকা থেকে বাদ পড়া।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব কারণে শিশুদের মাঝে একটি “ইমিউনিটি গ্যাপ” তৈরি হয়েছে। ফলে ভাইরাসটি দ্রুত এক শিশু থেকে অন্য শিশুর শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। 📉
আরো পড়ুন
কোন কোন জেলাকে হামের ‘হটস্পট’ ঘোষণা করা হয়েছে?
সরকার সংক্রমণের তীব্রতা বিবেচনা করে ২০টি জেলার ৩০টি এলাকাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই এলাকাগুলোতে বিশেষ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হচ্ছে।
প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো একনজরে:
| বিভাগ | জেলা ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা/পৌরসভা |
| রাজশাহী | পাবনা (পৌরসভা, সদর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, বেড়া), রাজশাহী (গোদাগাড়ী), নাটোর সদর, নওগাঁ (পোরশা), চাঁপাইনবাবগঞ্জ (সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট) |
| বরিশাল | বরগুনা (পৌরসভা ও সদর), বরিশাল (মেহেন্দীগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ), ঝালকাঠি (নলছিটি) |
| ঢাকা | গাজীপুর সদর, মুন্সীগঞ্জ (সদর ও লৌহজং), মাদারীপুর সদর, ঢাকা (নবাবগঞ্জ), শরীয়তপুর (জাজিরা) |
| চট্টগ্রাম | চাঁদপুর (সদর ও হাইমচর), কক্সবাজার (মহেশখালী ও রামু) |
| ময়মনসিংহ | নেত্রকোনার আটপাড়া, ময়মনসিংহ (সদর, ত্রিশাল ও তারাকান্দা) |
| খুলনা | যশোর সদর |
(প্রথম ধাপে এই এলাকাগুলোতে টিকাদান শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে এটি সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।)
আরো পড়ুন: ‘হোয়াইট প্লেগ’ যক্ষ্মার ভয়াবহ প্রত্যাবর্তন: বিশ্বে মৃত্যুর এক নম্বর কারণ এখন টিবি রোগ
বিশেষ হামের টিকা: কারা এবং কেন নেবেন?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়সের সকল শিশু এই টিকার আওতায় থাকবে। নিয়মিত টিকার বাইরে এই ডোজটি বাড়তি সুরক্ষা হিসেবে কাজ করবে।
বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির ছক:
- বয়সসীমা: ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু।
- সুবিধা: আগে টিকা নেওয়া থাকলেও এই বিশেষ ডোজ নেওয়া যাবে।
- অতিরিক্ত সেবা: হাম আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল প্রদান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, “একটি শিশুও যেন টিকার বাইরে না থাকে, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।” বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ডোজ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। 💉
হামের লক্ষণ ও প্রতিকার: বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের শুরুতে সাধারণ জ্বর মনে হলেও পরে কিছু জটিল লক্ষণ দেখা দেয়। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এটি শিশুর জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
হামের প্রধান লক্ষণসমূহ:
১. তীব্র জ্বর ও চোখ লাল হওয়া।
২. অনবরত কাশি হওয়া।
৩. শরীরের বিভিন্ন স্থানে লালচে র্যাশ বা দানা দেখা দেওয়া।
৪. খাবারে অরুচি বা ক্ষুধামন্দা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. বিলকিস সুলতানা জানান, র্যাশ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। কারণ এর থেকে নিউমোনিয়া বা কিডনির সমস্যা হতে পারে।
আরো পড়ুন: ই-হেলথ কার্ড কী ও কারা পাবেন? বাংলাদেশে ডিজিটাল স্বাস্থ্য সেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন
আক্রান্ত শিশুর যত্নে অভিভাবকদের করণীয়
যদি কোনো শিশুর হামের লক্ষণ দেখা দেয়, তবে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিকভাবে তার যত্ন নিতে হবে। নিয়মিত সঠিক পরিচর্যা শিশুকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।
কিছু জরুরি টিপস:
- শিশুকে স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার দিন।
- বুকের দুধ খাওয়ানো কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না।
- জ্বর বেশি হলে পরিষ্কার ভেজা কাপড় দিয়ে বারবার শরীর মুছে দিন।
- ডায়রিয়া বা ডিহাইড্রেশন দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও টিকাদানের সময়সীমা
এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্ব ব্যাংক, ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে। দ্রুত ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও বিতরণে তারা কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে।
বিশ্ব ব্যাংকের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, সরকারের পদক্ষেপগুলো মূলত দ্রুত ভ্যাকসিন বিতরণ ও সঠিক তথ্য প্রচারের ওপর জোর দিচ্ছে। এতে জনমনে অযথা আতঙ্ক কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে যে, আগামী ২১ মে ২০২৬ অর্থাৎ পবিত্র ঈদুল আজহার আগেই এই বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলস কাজ করছেন।
আরো পড়ুন: রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তারের তালিকা: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নাম ও সিরিয়াল দেওয়ার নিয়ম
শেষ কথা
বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জরুরি হামের টিকা কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত টিকাদান সম্পন্ন করতে স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকা দিলে শিশুদের গুরুতর জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা। শিশুর জ্বর বা র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং স্থানীয় টিকাদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া প্রয়োজন।
আপনি চাইলে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন। শিশু স্বাস্থ্য ও জাতীয় স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আরও আপডেট জানতে আমাদের ওয়েবসাইটটি বুকমার্ক করে রাখতে পারেন।
ডিসক্লেইমার: এই প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য সরকারি স্বাস্থ্য দপ্তর ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। শিশুর অসুস্থতার ক্ষেত্রে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।











