সিগারেট দাম নিয়ে এবার স্পষ্ট অবস্থান জানাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের ওপর নতুন কোনো শুল্ক-কর আরোপ করা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। ২৭ এপ্রিল ২০২৬, সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনে তামাক খাতের সাতটি সংগঠনের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি এ কথা জানান।
তবে শুধু কর না বাড়লেই যে সিগারেট দাম অপরিবর্তিত থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এনবিআর চেয়ারম্যান একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সিগারেটের দাম অস্বাভাবিক রকম কম। তাই মূল্য পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে রয়েছে।
সভায় তামাক শিল্পের একাধিক সংগঠন তাদের দাবি ও উদ্বেগ তুলে ধরে। আলোচনায় উঠে আসে অবৈধ সিগারেট আমদানি, কর ফাঁকি এবং রাজস্ব ঘাটতির মতো জরুরি বিষয়গুলো।
এনবিআর চেয়ারম্যান কী বললেন সিগারেট দাম নিয়ে?
মো. আবদুর রহমান খান জানান, সিগারেটের ওপর বর্তমানে ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-কর আরোপিত আছে এবং এর বেশি বাড়ানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এটি ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
তবে তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশেই বাংলাদেশের মতো এত কম দামে সিগারেট পাওয়া যায় না। এই বাস্তবতার আলোকে সিগারেট দাম পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। অর্থাৎ, নতুন কর না আসলেও দাম বাড়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ নয়।
আরো পড়ুন: ১০০ টাকার মোবাইল রিচার্জে ৩৮ টাকা কর: কী বললেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা?
বাংলাদেশে সিগারেট দাম কি সত্যিই কম? আঞ্চলিক তুলনা
জাপান টোব্যাকোর প্রতিনিধি সভায় দাবি করেন, বিশ্বের সর্বোচ্চ তামাক করারোপকারী দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। তারপরও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সিগারেটের খুচরা দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কম। নিচের তুলনামূলক চিত্রটি দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে —
| দেশ | সিগারেটের গড় দাম (প্রতি প্যাকেট) | মোট কর হার (আনুমানিক) |
|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ৪৫–৭০ টাকা | ৮৩% পর্যন্ত |
| ভারত | ১৫০–৩০০ টাকা | ৫২–৭৫% |
| পাকিস্তান | ১০০–২০০ টাকা | ৬৫–৭৮% |
| শ্রীলঙ্কা | ২০০–৩৫০ টাকা | ৭০–৮০% |
এই তুলনায় স্পষ্ট, কর হার বেশি হলেও বাংলাদেশে সিগারেটের প্যাকেটের খুচরা মূল্য এখনো আঞ্চলিকভাবে সবচেয়ে কম। ফলে মূল্য পুনর্নির্ধারণের যুক্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
অবৈধ সিগারেট রোধে আসছে ‘এয়ার কোড’ 🔍
কী এই এয়ার কোড বা কিউআর কোড?
এই সভার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘোষণা ছিল অবৈধ সিগারেট বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের নতুন পদক্ষেপ। এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, দেশীয় বৈধ সিগারেটের প্রতিটি প্যাকেটে কিউআর কোড বা এয়ার কোড বসানো হবে।
আরো পড়ুন
এই কোড স্ক্যান করে যেকোনো ভোক্তা নিজেই যাচাই করতে পারবেন, ওই সিগারেট থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে কিনা। এটি মূলত একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তামাক পণ্যের কর ফাঁকি রোধে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অবৈধ বাজার কতটা বড় সমস্যা?
ন্যাশনাল সিগারেট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশন এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো উভয়ই অবৈধ সিগারেট আমদানিকে এ খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আবুল খায়ের গ্রুপের পক্ষে শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, এই সমস্যা বন্ধ করতে হলে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।
আরো পড়ুন: রংপুরে ইতিহাস গড়ে এসএসসি পরীক্ষায় ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গ শিক্ষার্থী
১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সম্ভাবনা
কর ফাঁকি রোধ হলে কী হবে?
শেখ শাবাব আহমেদ দাবি করেন, তামাক খাতে বর্তমান অসম কর কাঠামো এবং অবৈধ আমদানির কারণে সরকার প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। তার মতে, নিচের তিনটি পদক্ষেপ নিলেই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে —
- সিগারেটের প্রিমিয়াম, মিড ও লো — তিন স্তরে মূল্য যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণ
- অবৈধ সিগারেট আমদানি কার্যকরভাবে বন্ধ করা
- কর ফাঁকি রোধে শক্তিশালী ডিজিটাল নজরদারি নিশ্চিত করা
এই তিনটি কাজ ঠিকমতো হলে আগামী অর্থবছরে শুধু সিগারেট খাত থেকেই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
মোবাইল খাতেরও দাবি ছিল এই সভায় 📱
প্রাক-বাজেট এই আলোচনায় মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতের প্রতিনিধিরাও গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার জানান, সিম কার্ড হারিয়ে গেলে পুনরায় ৩০০ টাকা ভ্যাট দিতে হয়, যা দ্বৈত করারোপের সামিল।
এছাড়া মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিক মুঠোফোন আমদানি রোধে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্ট্রার (NEIR) বাস্তবায়নের দাবি জানায়।
আরো পড়ুন: ২৫০০ টাকার মধ্যে স্মার্টফোন: গরিব মানুষের হাতেও পৌঁছাবে ডিজিটাল সেবা?
স্বাস্থ্য বনাম রাজস্ব: দুই পক্ষের যুক্তি
তামাক কর নীতি নিয়ে সবসময়ই দুটো বিপরীত মত থাকে। স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর মতে, সিগারেট দাম কম থাকলে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ধূমপানের হার বাড়ে। ফলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয়ও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে, শিল্পসংশ্লিষ্ট পক্ষের যুক্তি হলো, বারবার কর বাড়ালে বৈধ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভোক্তারা অবৈধ ও সস্তা সিগারেটের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এতে রাজস্ব বাড়ার বদলে আরও কমতে পারে। সরকারকে এই দুই যুক্তির মাঝে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে।
শেষ কথা
আগামী ২০২৬-২৭ বাজেটে সিগারেট দাম সরাসরি কর বৃদ্ধির মাধ্যমে না বাড়লেও, মূল্য পুনর্নির্ধারণের সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। এনবিআরের এয়ার কোড উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অবৈধ বাজার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে এবং রাজস্ব আদায়ও বাড়তে পারে।
তামাক কর নীতি কেবল রাজস্বের প্রশ্ন নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। আগামী বাজেটে এ বিষয়ে সরকার চূড়ান্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
বাজেট ২০২৬-২৭ সংক্রান্ত সর্বশেষ আপডেট ও বিশ্লেষণ পেতে আমাদের সাইট বুকমার্ক করে রাখুন এবং বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন। 🔖
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত এনবিআরের প্রাক-বাজেট আলোচনার সরকারি সূত্রের ভিত্তিতে তৈরি। চূড়ান্ত বাজেট ঘোষণার আগে যেকোনো তথ্য পরিবর্তন হতে পারে।











