বাংলায় ১২ মাসের নাম কি — এই সহজ প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশে প্রতিটি শিশু স্কুলে শেখে। অথচ পহেলা বৈশাখের মতো জাতীয় উৎসবের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদ বাংলার বারো মাসের নাম সঠিকভাবে বলতে পারলেন না — এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ঝড় তুলেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে পহেলা বৈশাখ ১৪৩২-এ, যখন একটি আলাপচারিতায় মোসাদ্দেককে বাংলা মাসের নাম ক্রমানুসারে বলতে বলা হয়। তিনি এলোমেলোভাবে কয়েকটি মাসের নাম বললেও সম্পূর্ণ ও ধারাবাহিকভাবে বলতে ব্যর্থ হন। বিষয়টির ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
একজন ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক, যিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির দায়িত্বে থাকেন, তাঁর এই অজ্ঞতা কেবল একটি ব্যক্তিগত সংকট নয় — এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে: আমরা কি আমাদের নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি?
আরো পড়ুন: ব্যর্থ আলোচনার পর উপযুক্ত সময়ে ইরানকে খতম করার হুমকি দিলেন ট্রাম্প
কী হয়েছিল সেদিন — ঘটনার বিস্তারিত
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে একটি অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদকে প্রশ্ন করা হয় — বাংলা ১২ মাসের নাম কি? উত্তরে তিনি বলেন: “আষাঢ়, জ্যৈষ্ঠ, শ্রাবণ, আশ্বিন, কার্তিক, পৌষ, মাঘ, অগ্রহায়ণ, ভাদ্র… হয়ে গেছে? হয়েছে? ফাল্গুন, ১২টা হয়েছে?”
লক্ষণীয়: তিনি মাসগুলো ধারাবাহিকভাবে বলেননি, বরং যা মাথায় এসেছে তাই বলেছেন। বৈশাখ ও চৈত্র মাসের নামই বাদ পড়ে গেছে — যে বৈশাখে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়, সেই মাসের নামটিই তিনি বলতে ভুলে গেছেন!
একজন সাংস্কৃতিক দায়িত্বশীল নেতার এই উত্তর স্বাভাবিকভাবেই হাসির খোরাক জোগায়। কিন্তু এর পেছনে আসলে একটি গভীর সমস্যা লুকিয়ে আছে — বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে আমাদের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা।
বাংলায় ১২ মাসের নাম কি — সঠিক তালিকা
যারা জানেন না বা ভুলে গেছেন, তাদের জন্য বাংলা বারো মাসের সঠিক ক্রম নিচে দেওয়া হলো। [ইন্টারনাল লিংক: বাংলা বর্ষপঞ্জি পরিচিতি]
| ক্রম | বাংলা মাসের নাম | গ্রেগরিয়ান সময়কাল (আনুমানিক) | ঋতু |
|---|---|---|---|
| ১ | বৈশাখ | মধ্য এপ্রিল – মধ্য মে | গ্রীষ্ম |
| ২ | জ্যৈষ্ঠ | মধ্য মে – মধ্য জুন | গ্রীষ্ম |
| ৩ | আষাঢ় | মধ্য জুন – মধ্য জুলাই | বর্ষা |
| ৪ | শ্রাবণ | মধ্য জুলাই – মধ্য আগস্ট | বর্ষা |
| ৫ | ভাদ্র | মধ্য আগস্ট – মধ্য সেপ্টেম্বর | শরৎ |
| ৬ | আশ্বিন | মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য অক্টোবর | শরৎ |
| ৭ | কার্তিক | মধ্য অক্টোবর – মধ্য নভেম্বর | হেমন্ত |
| ৮ | অগ্রহায়ণ | মধ্য নভেম্বর – মধ্য ডিসেম্বর | হেমন্ত |
| ৯ | পৌষ | মধ্য ডিসেম্বর – মধ্য জানুয়ারি | শীত |
| ১০ | মাঘ | মধ্য জানুয়ারি – মধ্য ফেব্রুয়ারি | শীত |
| ১১ | ফাল্গুন | মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য মার্চ | বসন্ত |
| ১২ | চৈত্র | মধ্য মার্চ – মধ্য এপ্রিল | বসন্ত |
বাংলা বছরের শুরু হয় বৈশাখ মাস দিয়ে এবং শেষ হয় চৈত্র দিয়ে। পহেলা বৈশাখ মানেই বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন — সেই মাসের নামটিই মোসাদ্দেকের তালিকায় ছিল অনুপস্থিত।
আরো পড়ুন
আরো পড়ুন: বসে না থেকে এই APPS দিয়ে 300 টাকা ইনকাম করুন: কাজ করা খুব সোজা ও নিরাপদ!
মনে রাখার সহজ কৌশল
বাংলা বারো মাস মনে রাখার জন্য একটি পরিচিত ছড়া প্রচলিত আছে যা অনেকেই ছোটবেলায় শিখেছেন। মাসগুলোর ছয়টি ঋতুতে ভাগ করে মনে রাখলেই সহজ হয়ে যায়:
- গ্রীষ্ম: বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ
- বর্ষা: আষাঢ়-শ্রাবণ
- শরৎ: ভাদ্র-আশ্বিন
- হেমন্ত: কার্তিক-অগ্রহায়ণ
- শীত: পৌষ-মাঘ
- বসন্ত: ফাল্গুন-চৈত্র
মোসাদ্দেক কী বললেন আরও — তোষামোদ ও সাহিত্য প্রসঙ্গ
শুধু বারো মাসের নাম নয়, ওই আলোচনায় মোসাদ্দেক কিছু বিষয়ে নিজের মতামতও তুলে ধরেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর রচিত প্রবন্ধ ‘তৈল’-এর কথা উল্লেখ করেন। মানুষ কীভাবে তোষামোদ বা চাটুকারিতার মাধ্যমে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকে এবং স্বার্থসিদ্ধি করে — এই বিষয়ে তাঁর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ছিল বেশ সরব।
তিনি বলেন, সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরাচারী শাসকের পাশে থেকেও তৈল দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে পিছপা হয় না। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যা লিখে যেতে পারেননি, মানুষ এই শিল্পকে সেই মাত্রায় নিয়ে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যও ছিল কাব্যিক — “এটি কখনো কৃষকের চোখের জল, আবার কখনো কৃষকের মুখের হাসি।” তবে যে উৎসব নিয়ে তিনি এত সুন্দর কথা বললেন, সেই উৎসবের মাসের নামটি জানার প্রশ্নে তিনি হোঁচট খেলেন — এটাই বিষয়টিকে বিতর্কিত করে তুলেছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া — কী বলছেন নেটিজেনরা?
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ফেসবুক, ইউটিউব ও টুইটারে বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়। বেশিরভাগ মন্তব্যে হতাশা ও ব্যঙ্গ প্রকাশ পেয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন — যিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির দায়িত্বে থাকেন, তাঁর কাছে এই সাধারণ জ্ঞান না থাকলে পদটির উদ্দেশ্য কতটুকু পূরণ হচ্ছে?
কেউ কেউ আবার মনে করেন, এই ঘটনাকে নিয়ে অতিরিক্ত সমালোচনাও ঠিক নয়। মানুষ সবকিছু মনে রাখতে পারেন না, বিশেষ করে চাপের মুহূর্তে। তবে পদ ও দায়িত্বের কথা মাথায় রাখলে, অন্তত বাংলা মাসের নামটুকু জানা থাকা উচিত ছিল — এই মতের সমর্থকের সংখ্যাই বেশি।
আরো পড়ুন: ৫টি High-Paying AI Jobs যা তুমি এখনই করতে পারো, Coding Skills ছাড়াই!
ডাকসু কী এবং এই পদের গুরুত্ব কতটুকু?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এবং প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। এই সংসদে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের পদটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই ব্যক্তিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন।
বাংলা ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও নানা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ডাকসুর ভূমিকা ঐতিহাসিক। এই প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক শাখার দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মৌলিক জ্ঞান থাকা তাই কেবল প্রত্যাশিত নয়, বরং অপরিহার্য।
এই ঘটনা কি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, নাকি বৃহত্তর সংকটের লক্ষণ?
মোসাদ্দেকের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। বাস্তবে, বাংলাদেশে বা পশ্চিমবঙ্গে অনেক শিক্ষিত মানুষই আজ বাংলা মাসের নাম, বাংলা সাহিত্যের মূল রচনা বা বাংলা সংস্কৃতির মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ও ডিজিটাল জীবনধারার প্রভাবে মাতৃভাষার চর্চা ক্রমশ কমছে।
পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয় জাঁকজমকের সাথে, কিন্তু যে ভাষায় এই উৎসবের প্রাণ — সেই বাংলা ভাষার প্রতি দৈনন্দিন যত্ন ও চর্চা কমে যাচ্ছে। এটি একটি সামাজিক সতর্কসংকেত।
শেষ কথা
বাংলায় ১২ মাসের নাম কি — এই প্রশ্নটি সহজ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের পরিচয়ের গভীরতম শিকড়। 📅 বৈশাখ থেকে চৈত্র — এই বারো মাসই বাঙালির জীবনচক্র, ঋতুবৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তি। একজন সাংস্কৃতিক নেতার কাছে এই জ্ঞান থাকাটা মৌলিক দায়িত্বের অংশ।
মোসাদ্দেকের এই ঘটনা আমাদের সবাইকে একটু থামিয়ে ভাবতে বলছে — আমরা কি আমাদের নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে যথেষ্ট মূল্য দিচ্ছি? 🌸 পহেলা বৈশাখের উৎসব পালন করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলা ভাষার মূল জ্ঞান ধরে রাখাও সমান জরুরি।
এই খবরটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন এবং বাংলা বারো মাসের নাম ও ঋতুবিভাগ নিয়ে আমাদের বিস্তারিত আর্টিকেলটি পড়ুন — কারণ জানা মানেই আমাদের শিকড়কে সম্মান করা।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও ও তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি কোনো ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ বা হেয় করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং জনস্বার্থে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরাই এই প্রতিবেদনের লক্ষ্য।











