আপনি প্রতিদিন মোবাইলে ১০০ টাকা রিচার্জ করেন। কিন্তু সেই ১০০ টাকার মধ্যে আসলে কত টাকার সেবা পাচ্ছেন, জানেন কি? মাত্র ৬২ টাকা। বাকি ৩৮ টাকা চলে যাচ্ছে সরকারের কোষাগারে বিভিন্ন কর ও শুল্ক হিসেবে। এই মোবাইল রিচার্জ কর নিয়েই এবার সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একজন নীতিনির্ধারক।
শনিবার (২৫ এপ্রিল ২০২৫) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে একটি হোটেলে টেলিকম পলিসি বিষয়ক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এই কথা বলেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, গরিব মানুষের কাছ থেকে এভাবে কর কেটে নেওয়া ঠিক হচ্ছে না এবং সরকার এই কর কমানোর জন্য ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে।
বিষয়টি শুধু সংখ্যার বিষয় নয় — দেশের ১৮ কোটির বেশি সিমকার্ড ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন খরচের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এই ঘোষণা সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আরো পড়ুন: সরকার কি রংপুরকে বঞ্চনার ‘ক্ষতিপূরণ’ দেবে? রংপুর বিভাগের উন্নয়নে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও প্রত্যাশা
১০০ টাকার রিচার্জে আসলে কত টাকা কর দিচ্ছেন?
অনেকে মনে করেন মোবাইলে ১০০ টাকা দিলে ১০০ টাকার সেবা পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমানে মোবাইল সেবায় একাধিক স্তরে কর আরোপ করা আছে, যার সবটুকু বহন করতে হয় সাধারণ গ্রাহককে।
বর্তমানে মোবাইল সেবায় ২৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, প্রায় ১৮ শতাংশ কার্যকর ভ্যাট এবং ১ শতাংশ সারচার্জ প্রযোজ্য। এই তিনটি মিলিয়ে মোট করের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ শতাংশ, যা সরাসরি গ্রাহকদের ওপর প্রভাব ফেলে।
এর পাশাপাশি রয়েছে রেভিনিউ শেয়ার, মিনিমাম ট্যাক্স এবং পরোক্ষ করের আলাদা বোঝা। সব মিলিয়ে হিসাব করলে দেখা যায়:
| করের ধরন | হার/পরিমাণ |
|---|---|
| সম্পূরক শুল্ক | ২৩% |
| কার্যকর ভ্যাট | ~১৮% |
| সারচার্জ | ১% |
| রেভিনিউ শেয়ার ও মিনিমাম ট্যাক্স | ~৬.১% |
| পরোক্ষ কর | ~২০.৪% |
| মোট কর (প্রায়) | ৫৬+ টাকা |
উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ যখন ৩৮ টাকার কথা বললেন, তখন তিনি মূলত সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও সারচার্জের সম্মিলিত চিত্রটিই তুলে ধরেছেন।
কীভাবে এত বেশি কর আরোপ হলো?
এই উচ্চ করের পেছনে রয়েছে কয়েক বছরের ধারাবাহিক শুল্কবৃদ্ধির ইতিহাস। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল সেবায় সম্পূরক শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। এরপর মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আরও ৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
আরো পড়ুন
সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৩ শতাংশ করার পর থেকে গ্রাহকদের ১০০ টাকায় ৫৬ টাকার বেশি কর দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ, মোবাইলে ১০০ টাকা ভরলে গ্রাহক আসলে ব্যবহার করতে পারছেন মাত্র ৪৩-৪৪ টাকার সেবা।
আরো পড়ুন: এবার আসছে ‘ফুয়েল কার্ড’: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মিলবে যেসব সুবিধা, আবেদন করতে যা যা লাগবে
উপদেষ্টা কী বললেন এবং সরকারের পরিকল্পনা কী?
সেমিনারে উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ সরাসরি বলেন, দেশের গরিব মানুষের কাছ থেকে এভাবে কর কেটে নেওয়া ঠিক হচ্ছে না। তিনি আরও জানান, এই কর-ভ্যাট কমানোর প্রক্রিয়া সরকার শুরু করেছে।
মোবাইল গ্রাহকদের আর্থিক চাপ কমাতে আসন্ন বাজেটে শুল্কহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা। পাশাপাশি তিনি টেলিকম সেবার মান নিয়ে নিজেই হতাশা প্রকাশ করে বলেন, গ্রাহক অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না — এটা সরকারের ব্যর্থতা।
দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরেন:
- দেশের ৯০ শতাংশ মানুষকে ফাইভজি সেবার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
- ন্যূনতম ১০০ এমবিপিএস গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গ্রাহক ও বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
টেলিকম খাত বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই অতিরিক্ত কর নিয়ে সরব। বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মহিউদ্দিন আহমেদ উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, ইন্টারনেট পরিষেবায় বিশ্বের তলানিতে থেকেও ভ্যাটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে।
দেশের ৪৮ শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেটের বাইরে থাকলেও উচ্চ করারোপের কারণে ডিজিটাল বৈষম্য আরও বাড়ছে।
এই করের প্রভাব কতটা গভীর?
মোবাইল ফোন এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকার হাতিয়ার। রিকশাচালক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী — সবাই মোবাইলে যোগাযোগ করেন, বিকাশ-নগদে টাকা পাঠান।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি ১০০ টাকার রিচার্জ থেকে ৩৮ টাকা কেটে নেওয়া মানে সরাসরি তাদের পকেট কাটা। 📉
অন্যদিকে, উচ্চ করের কারণে অপারেটরদের নেটওয়ার্ক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করার সক্ষমতাও কমে আসছে। ফলে সেবার মান উন্নত হচ্ছে না — এটি একটি দুষ্টচক্র।
কর কমলে কী সুবিধা পাবেন?
যদি সরকার মোবাইল রিচার্জে কর কমানোর উদ্যোগ বাস্তবে রূপ দেয়, তাহলে সুবিধা হবে একাধিক দিক থেকে:
- সাধারণ গ্রাহক প্রতি রিচার্জে বেশি ব্যালেন্স পাবেন।
- ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ কমবে, ডিজিটাল সেবায় আরও বেশি মানুষ যুক্ত হবে।
- মোবাইল অপারেটররা বিনিয়োগ বাড়াতে পারবে, নেটওয়ার্কের মান উন্নত হবে।
- ফাইভজি সম্প্রসারণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সহজতর হবে।
আরো পড়ুন: ফ্যামিলি কার্ড কী, কারা পাবেন এবং আবেদনে কী কী লাগবে? জানুন বিস্তারিত
কখন কার্যকর হবে এই পরিবর্তন?
উপদেষ্টা সুনির্দিষ্ট তারিখ না জানালেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, আসন্ন বাজেটে এই পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। টেলিকম খাতের উন্নয়ন এবং সেবার মান বাড়াতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ব্রডব্যান্ড সেবাদাতাদের জন্য ‘অ্যাকটিভ শেয়ারিং’ সুবিধা চালুর বিষয়টিও দ্রুত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শুধু ঘোষণাই যথেষ্ট নয় — বাজেটে সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের এই বাড়তি করই বহন করে যেতে হবে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এনবিআর যদি সম্পূরক শুল্ক আবার ১৫ বা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে, তাহলে সেটিই হবে গ্রাহকদের জন্য বাস্তব স্বস্তি। 📱
শেষ কথা
মোবাইল রিচার্জ কর নিয়ে সরকারের উপদেষ্টার এই স্বীকারোক্তি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সংকেত। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচের এই বিষয়টি নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আলোচনায় আসাটাই অনেক দিনের দাবি ছিল। তবে প্রকৃত পরিবর্তন আসতে হলে বাজেটে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই বিষয়ে যেকোনো নতুন তথ্য বা প্রজ্ঞাপন জারি হলে jugeralo.com সবার আগে আপনাকে জানাবে। এখনই আমাদের ওয়েবসাইট বুকমার্ক করে রাখুন, যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আপডেট মিস না হয়।
এই খবরটি আপনার পরিচিতদের জানান — কারণ মোবাইল রিচার্জে কর কমানোর বিষয়টি আমাদের সবার স্বার্থের সাথে জড়িত। 🔔 এ ধরনের আরও প্রাসঙ্গিক খবর পড়তে আমাদের অর্থনীতি ও টেলিকম বিভাগটি ঘুরে আসুন।
Disclaimer: এই আর্টিকেলে উল্লিখিত তথ্যসমূহ সরকারি ঘোষণা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি। কর কমানো সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাজেট ঘোষণার পরেই নিশ্চিত হবে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য এনবিআর বা সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুসরণ করুন।













