অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ক্রুড অয়েল) তীব্র সংকটে পড়ে অবশেষে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার — চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেড। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুর থেকে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল উৎপাদনকারী দুটি ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রোববার বিকাল পর্যন্ত সীমিত পরিশোধন কার্যক্রম চলেছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত কাঁচামাল মজুত না থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত সংকটজনক হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, তিনটি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে দুটি এখন সম্পূর্ণ অচল। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করত এই একটি শোধনাগার।
এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ — মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন, এবং সৌদি আরব থেকে নির্ধারিত সময়ে ক্রুড অয়েলের চালান না আসা। ⛽
ইস্টার্ন রিফাইনারি: দেশের জ্বালানি খাতের মেরুদণ্ড
কী এই প্রতিষ্ঠান?
ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেড বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার, যা চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় অবস্থিত। এটি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)-এর অধীনে পরিচালিত হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪,০০০ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করার সক্ষমতা রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের।
প্রতিষ্ঠানটি মোট ১৩ ধরনের পরিশোধিত জ্বালানি উৎপাদন করে, যার মধ্যে রয়েছে:
- পেট্রোল
- ডিজেল
- অকটেন
- কেরোসিন
- জেট ফুয়েল
- বিটুমিন
- ফার্নেস অয়েল (সহ অন্যান্য)
দেশের মোট পরিশোধিত জ্বালানির ২০ শতাংশের বেশি আসত এই একটি শোধনাগার থেকে। বাকি চাহিদা পূরণ হতো বিদেশ থেকে সরাসরি পরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে।
আরো পড়ুন: ৫টি High-Paying AI Jobs যা তুমি এখনই করতে পারো, Coding Skills ছাড়াই!
কেন বন্ধ হলো উৎপাদন?
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ধাক্কা বাংলাদেশে
ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম জানান, “অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারি ১৪ এপ্রিল থেকে বন্ধ হয়েছে। পেট্রোল, ডিজেল, অকটেন, কেরোসিন তৈরির ইউনিটটি এখন সম্পূর্ণ অচল।”
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের এই রিফাইনারিতে। চলতি এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই কাঁচামালের সংকট অনুভব করছিল প্রতিষ্ঠানটি।
আরো পড়ুন
পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ ৫ এপ্রিল থেকে বিকল্প পন্থায় সীমিত উৎপাদন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
সৌদি জাহাজ আসেনি নির্ধারিত সময়ে
সংকটের একটি বড় কারণ হলো — সৌদি আরব থেকে ক্রুড অয়েলবাহী একটি জাহাজ নির্ধারিত সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়নি। ফলে যে মজুত ছিল, তা দিয়েই চালিয়ে যেতে হচ্ছিল এতদিন। আর সেই মজুতও এখন শেষ।
প্রতিষ্ঠানটির ক্রুড অয়েল সংরক্ষণ ক্ষমতা দেড় লাখ মেট্রিক টন এবং পরিশোধিত তেল রাখার ক্ষমতা আড়াই লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু মজুত শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় এই বিশাল অবকাঠামোও এখন নিষ্ক্রিয়।
এখন কী চলছে রিফাইনারিতে?
তিনটি ইউনিটের মধ্যে তৃতীয় ইউনিটে এখনও সীমিত পরিসরে কিছু উৎপাদন চলছে। তবে সেটি কেবল:
| উৎপাদন | পরিমাণ |
|---|---|
| বিটুমিন | সীমিত পরিসরে |
| পেট্রোল | অতি সামান্য |
| অকটেন | অতি সামান্য |
এই উৎপাদন দেশের বাস্তব চাহিদার তুলনায় নগণ্য। প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম বলেন, “দেশের চাহিদা হচ্ছে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল — এই জিনিসগুলোর যে ঘাটতি তৈরি হবে, সেটা পূরণ করতে বিপিসি বিদেশ থেকে পরিশোধিত তেল এনে মেকআপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।”
দেশের জ্বালানি সরবরাহে কি সংকট হবে?
বিপিসির বিকল্প পরিকল্পনা
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ইতিমধ্যে বিদেশ থেকে সরাসরি ফিনিশড প্রোডাক্ট অর্থাৎ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। এই মুহূর্তে দেশের জ্বালানি ঘাটতি পূরণের এটিই একমাত্র বিকল্প পথ।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিশোধিত তেল আমদানি করতে স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের চেয়ে বেশি খরচ পড়ে। ফলে এই সাময়িক সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা জ্বালানি খাতে বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
📌 [এখানে পড়ুন: বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ ও ভর্তুকি ব্যবস্থা]
কবে স্বাভাবিক হবে উৎপাদন?
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব থেকে নতুন একটি চালান পাঠানোর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামী ১৮ এপ্রিল প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল জাহাজে তোলার কথা রয়েছে। সেই জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর সম্ভাব্য তারিখ ৫ মে।
চালানটি নির্ধারিত সময়ে পৌঁছালে ৫ মে-র পর থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি আবার পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফিরতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের চোখে এই সংকটের গভীরতা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার বন্ধ হওয়া শুধু উৎপাদনের ক্ষতি নয় — এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একটিমাত্র সরবরাহ উৎসের উপর নির্ভরশীলতা এবং পর্যাপ্ত মজুত না রাখার সমস্যা দীর্ঘদিনের।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে — শুধু একটি জাহাজের বিলম্বেই যদি দেশের একমাত্র রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে জ্বালানি খাতে আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী? ভবিষ্যতে এই ধরনের সংকট এড়াতে একাধিক উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং পর্যাপ্ত রিজার্ভ মজুত রাখার ব্যবস্থা জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 🔍
📌 [আরও পড়ুন: বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা]
একনজরে মূল তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| প্রতিষ্ঠান | ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেড |
| অবস্থান | পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম |
| উৎপাদন বন্ধের তারিখ | ১৪ এপ্রিল ২০২৫ |
| বন্ধ ইউনিট | দুটি (পেট্রোল, ডিজেল, অকটেন ইউনিট) |
| সক্রিয় ইউনিট | একটি (সীমিত বিটুমিন উৎপাদন) |
| দৈনিক শোধন সক্ষমতা | প্রায় ৪,০০০ মেট্রিক টন |
| দেশীয় চাহিদায় অবদান | প্রায় ২০% |
| নতুন চালান জাহাজে ওঠার তারিখ | ১৮ এপ্রিল ২০২৫ |
| চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর সম্ভাব্য তারিখ | ৫ মে ২০২৫ |
| আসন্ন চালানের পরিমাণ | প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন |
শেষ কথা
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার বন্ধ হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর আমাদের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং একক সরবরাহ উৎসের উপর ভরসা করার ঝুঁকি এবার স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। বিপিসি বিকল্প আমদানির মাধ্যমে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও, এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
আশার কথা হলো, নতুন ক্রুড অয়েলের চালান ৫ মে বন্দরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেদিন থেকেই পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরুর প্রত্যাশা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে এই মধ্যবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের জ্বালানি পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক থাকবে, তা নির্ভর করবে বিপিসির দ্রুত ও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থাপনার উপর।
আপনার মতামত জানান — এই সংকট থেকে বের হতে সরকার কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত? 💬 এই সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন এবং দেশের জ্বালানি বিষয়ক সর্বশেষ আপডেটের জন্য আমাদের সাইটে চোখ রাখুন।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত সরকারি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। পরিস্থিতির পরিবর্তনে তথ্য আপডেট হতে পারে। জ্বালানি সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য সরকারি ঘোষণা অনুসরণ করুন।











