বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীকে (এবিসি) ঘিরে সম্প্রতি বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে সুশীল সমাজে পরিচিতি থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে ‘লুটপাট কোম্পানি’ পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।
বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে গত ১৮ মাসে তারা পরিবেশ খাতসহ বিভিন্ন সেক্টর থেকে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রিজওয়ানা হাসান এবং তার স্বামী এবি সিদ্দিকী।
পরিবেশ রক্ষায় আপসহীন ভাবমূর্তি থাকা সত্ত্বেও নেপথ্যে অন্যরকম কর্মকাণ্ডের খবর প্রকাশ্যে এসেছে। পারিবারিক ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান প্রশাসনিক কার্যক্রম, সবখানেই বিতর্কের ছায়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: সুশীল ভাবমূর্তি বনাম পারিবারিক ইতিহাস
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ আইনবিদ হিসেবে পরিচিত। তবে সম্প্রতি তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মেধার চেয়ে বিশেষ কিছু যোগ্যতায় তিনি সুশীল সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এসেছেন।
তার বাবা সৈয়দ মহিবুল হাসান একাত্তরের বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ আছে, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করেছেন এবং স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে ছিলেন।
রিজওয়ানা হাসান এই ইতিহাস আডাল করে সুশীল মহলে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছেন বলে সমালোচকরা দাবি করেন। পারিবারিক কলঙ্ক সত্ত্বেও তিনি টিভি টকশো এবং নাগরিক আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। বর্তমানে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার এবং স্বামীর কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
আরো পড়ুন: ড. ইউনূসের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ, হাম টিকা নিয়ে তদন্ত দাবি
স্বামী এবি সিদ্দিকী ও ‘হামিদ ফ্যাশন’ কানেকশন
রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী মূলত নসরুল হামিদ বিপুর মালিকানাধীন ‘হামিদ ফ্যাশন’-এর নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। নসরুল হামিদ ছিলেন বিগত সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন প্রতিমন্ত্রী।
২০১৪ সালে এবি সিদ্দিকীর অপহরণের ঘটনাটি দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। পরে বিভিন্ন মহলে জানা গেছে যে, সেটি একটি সাজানো নাটক ছিল। এই নাটকের মাধ্যমে লাইমলাইটে আসা এবং রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
আরো পড়ুন
বর্তমানে নসরুল হামিদের বিপুল সম্পদ দেখাশোনার দায়িত্ব কার্যত এবি সিদ্দিকীর হাতে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিপুল সম্পদের বিপরীতে বিভিন্ন স্থানে জমি কেনাবেচা এবং অবৈধ অর্থ পাচারের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে জোরালো হচ্ছে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ ও টেন্ডার দুর্নীতি
উপদেষ্টা হওয়ার পর রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে পর্দার আড়ালে বিশাল অংকের লেনদেন হয়েছে।
বিশেষ করে বন সংরক্ষক নিয়োগে শত কোটি টাকার বাণিজ্যের তথ্য বিভিন্ন সূত্রে বেরিয়ে আসছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন বড় প্রকল্পে ঘনিষ্ঠজনদের কোটি কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রচারণার নামে এবং পরিবেশগত গবেষণার দোহাই দিয়ে অনেক সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। রিজওয়ানা হাসান ও তার স্বামী এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারের পরিবেশ নীতির স্বচ্ছতা চরমভাবে বিপন্ন করেছেন।
আরো পড়ুন: ঢাকাসহ ১৫ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড় ও বজ্রবৃষ্টির সতর্কতা
পলিথিন ও ইটভাটা নিয়ে দ্বিমুখী অবস্থান
দায়িত্ব নেওয়ার পর রিজওয়ানা হাসান বড় ঘটা করে পলিথিন নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন। শুরুর দিকে বিভিন্ন সুপার শপ ও শপিং মলে লোক দেখানো অভিযানও চালানো হয়, তবে রহস্যজনকভাবে কিছু মাসের মধ্যেই তা থেমে যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পলিথিন উৎপাদকদের সঙ্গে এবি সিদ্দিকীর গোপন বৈঠক ও বড় অংকের লেনদেনের পরই এই অভিযান স্তিমিত হয়ে পড়ে। ইটভাটার লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও উপদেষ্টার স্বামীর ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
ভুক্তভোগী আবেদনকারীরা পরিবেশ অধিদপ্তরে গেলে প্রায়ই তাঁরা এবি সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করার অলিখিত পরামর্শ পেয়েছেন। এভাবে পরিবেশ রক্ষার নামে এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সিলেটের সাদা পাথর ও সেন্টমার্টিন কেলেঙ্কারি
সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর পর্যটন কেন্দ্রের অবৈধ পাথর উত্তোলন নিয়ে রিজওয়ানা হাসানের দীর্ঘ নীরবতা জনমনে প্রশ্ন তুলেছে। পাথর লুট রুখতে জেলা প্রশাসকের সেনা মোতায়েনের আবেদনও সময়মতো গ্রহণ করা হয়নি।
পরবর্তীতে তিনি এই পাথর লুটের দায় চাপান স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ওপর। অন্যদিকে সেন্টমার্টিনে সাধারণ পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত করার বিতর্কিত সিদ্ধান্তটিও বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, দ্বীপটি একটি বিশেষ বিদেশি শক্তির কাছে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষার দোহাই দিয়ে সেন্টমার্টিনের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নষ্ট করা হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন।
আরো পড়ুন: Vivo V70 FE রিভিউ ২০২৬: ২০০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা ও ৭০০০mAh ব্যাটারির দানবীয় ফোন!
দুদকের ক্রোক তালিকা ও সম্পদ পর্যালোচনা
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নসরুল হামিদের অবৈধ সম্পদ ক্রোকের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, রিজওয়ানা হাসানের সরাসরি হস্তক্ষেপে গুলশানের কিছু মূল্যবান জমি ক্রোকের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ এইভাবে নথিপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে হাতবদল করার চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে জোর দাবি উঠেছে যে, এই দম্পতির সকল সম্পত্তির হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
দেশের অনেক রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের দাবি তুলেছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এই ‘লুটপাট কোম্পানি’র আসল চেহারা উন্মোচনের দাবি এখন সর্বস্তরে।
শেষ কথা: আস্থার সংকটে পরিবেশ মন্ত্রণালয়
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও তার স্বামী এবি সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বর্তমান প্রশাসনের স্বচ্ছতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই দুর্নীতির খবর জনগণের মাঝে তীব্র আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের হওয়া এখন সময়ের দাবি। দোষী প্রমাণিত হলে এটি ক্ষমতার অপব্যবহারের এক জঘন্য উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে।
এই প্রতিবেদনটি শেয়ার করুন এবং আমাদের ওয়েবসাইট বুকমার্ক করুন।
ডিসক্লেইমার: উপস্থাপিত তথ্য বিভিন্ন সংবাদ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে তৈরি। আইনিভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।











