আগামী ১২ মে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী তাদের ১১ জন প্রার্থীর তালিকা চূড়ান্ত করেছে বলে জানিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। একাধিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
এবারের মনোনয়নে যে বিষয়টি আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এসেছে তা হলো, দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের স্ত্রী, কন্যা বা নিকটাত্মীয়দের সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
রাজনৈতিক দলগুলোয় পরিবারতন্ত্রের যে দীর্ঘদিনের সমালোচনা রয়েছে, জামায়াত এবার সেই পথ থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। কতটা কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়ন হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আরো পড়ুন: শূন্য থেকে অনলাইনে ইনকাম করার উপায়: ঘরে বসে আয়ের ১০টি বাস্তব ও পরীক্ষিত পদ্ধতি ২০২৬
কতটি সংরক্ষিত আসন পাচ্ছে জামায়াত?
জাতীয় সংসদে মোট সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেনের তথ্যমতে, প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত আসন বণ্টিত হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৬৮টি আসন জিতে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়া জামায়াতে ইসলামী এই অনুপাতে পাচ্ছে ১১টি সংরক্ষিত আসন।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় ঐক্য’ জোট মোট ১৩টি আসন পাচ্ছে। বিএনপি জোট পাচ্ছে ৩৬টি এবং স্বতন্ত্ররা মিলে একটি আসন পাবেন।
| জোট/দল | সংরক্ষিত আসন সংখ্যা |
|---|---|
| বিএনপি জোট | ৩৬টি |
| জামায়াত জোট (১১ দলীয় ঐক্য) | ১৩টি |
| স্বতন্ত্র | ১টি |
| মোট | ৫০টি |
জামায়াতের ১৩টির মধ্যে ১১টি নিজেরা পূরণ করবে, বাকি দুটি জোট শরিকদের দেওয়া হবে। একটি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাচ্ছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্যটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশসহ অন্য শরিকদের মধ্যে কে পাবে, তা নিয়ে আলোচনা এখনও চলছে।
পরিবারতন্ত্র এড়ানোর ঘোষণা — কী বলছেন নেতারা?
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা পোস্টকে জানান, দলের নির্বাচিত এমপিদের পরিবারের কেউ এবার সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাবেন না। এটি শুধু কথার কথা নয়, দলীয় নীতি হিসেবেই এটা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আরো পড়ুন
আরো পড়ুন: বাজারে গায়েব সয়াবিনের বোতল, সোনালি মুরগির রেকর্ড দাম — ভোক্তারা কতটা বিপাকে?
তবে একটি সূক্ষ্ম ব্যতিক্রমের কথাও উঠে এসেছে। দলের এক কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জানিয়েছেন, যেসব প্রার্থী জোটের কারণে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছিলেন বা নির্বাচনে হেরেছিলেন তাদের পরিবারের কেউ যোগ্য ও জনপ্রিয় হলে তাকে বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
অর্থাৎ, বিষয়টি সম্পূর্ণ কঠোর নয়, বরং শর্তসাপেক্ষ একটি নমনীয়তা রাখা হয়েছে।
কীভাবে হলো প্রার্থী বাছাই?
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানিয়েছেন, দলের মহিলা বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল প্রার্থী বাছাইয়ের। পুরো মার্চ মাস ধরে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত মতামত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করা হয়।
মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নেসা সিদ্দীকা ১১ এপ্রিল জানান, প্রার্থী চূড়ান্তে যেসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো:
- দলীয় পদ ও দল পরিচালনার যোগ্যতা
- সততা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা
- সংসদে আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখার সক্ষমতা
- বিভিন্ন এলাকার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা
- গণমাধ্যমে পরিচিত মুখ ও জনমানসে গ্রহণযোগ্যতা
এই মানদণ্ড বিবেচনায় ১২ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা দলের আমিরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে ১১ জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
আলোচনায় যারা আছেন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে
দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, চূড়ান্ত তালিকায় কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের একাধিক সদস্য, ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাবেক শীর্ষ নেত্রী এবং গণমাধ্যমে পরিচিত কয়েকজন নারী নেত্রী রয়েছেন। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে:
- নুরুন্নেসা সিদ্দীকা — জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি
- মারদিয়া মমতাজ — ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক
- সাবিকুন্নাহার মুন্নী — আইনজীবী, কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দের স্ত্রী
- ডা. হাবিবা চৌধুরী সুইট — ছাত্রী সংস্থার সাবেক সভানেত্রী, জামায়াতের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্সের প্রধান
- ড. ফেরদৌস আরা বকুল — কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেত্রী
উল্লেখ্য, জামায়াতের ৮৮ সদস্যের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে নারী সদস্য রয়েছেন ২১ জন। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ আমিরসহ শীর্ষ নেতাদের পরিবার থেকেও রয়েছেন। পরিবারতন্ত্র না করার ঘোষণার প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কিছুটা কৌতূহল রয়েছে।
আরো পড়ুন: যুদ্ধবিরতিতে চুপ থাকায় নিজের দেশেই ক্ষোভের মুখে নেতানিয়াহু
জামায়াতের সংরক্ষিত আসনের ইতিহাস
এটাই প্রথম নয় যে জামায়াত সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারে গেলে জামায়াতের চারজন নারী সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হন। ১৯৯৬ সালেও দুজন সংরক্ষিত আসনে ছিলেন।
২০০১-২০০৬ মেয়াদে জামায়াত মনোনীত সদস্যরা ছিলেন জামালপুরের সুলতানা রাজিয়া, সিলেটের ডা. আমিনা বেগম (বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানের স্ত্রী), রাজশাহীর শাহানারা বেগম এবং সাতক্ষীরার বেগম রোকেয়া আনসার।
এবারের তুলনায় সেই সময়ের মনোনয়নে পরিবার-সংশ্লিষ্টতার নজির আছে, যা এবার ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে বলে দল দাবি করছে। 🏛️
নির্বাচনের তফসিল এক নজরে
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়াটি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে:
| তারিখ | কার্যক্রম |
|---|---|
| ২১ এপ্রিল | মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন |
| ২২-২৩ এপ্রিল | মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই |
| ২৬ এপ্রিল | আপিল দায়েরের শেষ তারিখ |
| ২৭-২৮ এপ্রিল | আপিল নিষ্পত্তি |
| ২৯ এপ্রিল | প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় |
| ৩০ এপ্রিল | প্রতীক বরাদ্দ |
| ১২ মে | ভোট গ্রহণ |
রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মইনুদ্দিন খান এবং সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মনির হোসেন। নির্বাচনে চারজন পোলিং এজেন্টও নিয়োজিত থাকবেন। 🗳️
শেষ কথা: জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসন
জামায়াতের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিছুটা ভিন্নধর্মী। পরিবারতন্ত্র এড়ানোর ঘোষণা দেওয়াটা সহজ, কিন্তু কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে শীর্ষ নেতাদের পরিবার-সংশ্লিষ্টরা থাকায় বাস্তবে এটি কতটা প্রতিফলিত হবে তা মনোনয়নের চূড়ান্ত ঘোষণার পরই স্পষ্ট হবে।
আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ১২ মে-র নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ইতিমধ্যেই জমে উঠেছে। নতুন কোনো তথ্য এলে এই প্রতিবেদন আপডেট করা হবে।
এই প্রতিবেদনটি উপকারী মনে হলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। রাজনৈতিক খবরের সর্বশেষ আপডেট পেতে আমাদের ওয়েবসাইট বুকমার্ক করে রাখুন।
⚠️ Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি সর্বশেষ উপলব্ধ দলীয় সূত্র ও ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত বিবৃতির ভিত্তিতে তৈরি। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত না হওয়া পর্যন্ত এটি পরিবর্তনযোগ্য। নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য জামায়াতে ইসলামীর অফিশিয়াল বিবৃতি অনুসরণ করুন।











