ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি সাম্প্রতিক ভিডিও বার্তা ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। শুক্রবার (১৩ মার্চ, ২০২৬) প্রকাশিত ওই ভিডিওতে নেতানিয়াহুর ৬ আঙুল দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করছেন অনেক নেটিজেন। বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে দানা বাঁধছে নানা রহস্য।
ভিডিওটি কি আসলেও বাস্তব নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক উপস্থিতি নিয়ে এমন প্রশ্ন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অনেকেই একে কেবল ‘টেকনিক্যাল গ্লিচ’ হিসেবে দেখলেও কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু নিয়ে গুঞ্জন ছড়াচ্ছেন। বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এ ধরণের তথ্য বিভ্রান্তি জনমনে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
নেতানিয়াহুর ভিডিওতে অসংগতি: যা দেখল বিশ্ব
গত শুক্রবার নেতানিয়াহু তাঁর অফিসিয়াল ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে একটি ভিডিও বার্তা শেয়ার করেন। ভিডিওটিতে তিনি মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। উল্লেখ্য, আজ শনিবার এই যুদ্ধের ১৫তম দিন চলছে।
ভিডিওটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে ব্যবহারকারীরা দাবি করছেন, নেতানিয়াহুর ডান হাতে ছয়টি আঙুল দৃশ্যমান। সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি এখন ‘ক্ল্যাসিক এআই ফিঙ্গার গ্লিচ’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় এআই দিয়ে ভিডিও জেনারেট করলে মানুষের হাত বা আঙুলের গঠন নিখুঁত হয় না, যা এখানে ঘটেছে বলে অনেকে মনে করছেন।
আরো পড়ুন: ৫ কারণে মনে করা হচ্ছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আর নেই: আসল সত্য কী?
মৃত্যু গুঞ্জন ও ক্যান্ডাস ওয়েনসের প্রশ্ন
নেতানিয়াহুর এই ভিডিও প্রকাশের পর থেকেই তাঁর অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন রক্ষণশীল বিশ্লেষক ক্যান্ডাস ওয়েনস যখন প্রশ্ন তুলেছেন “বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) কোথায়?”, তখন বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে আরও গুরুত্ব পায়।
ওয়েনস তাঁর পোস্টে দাবি করেন, কেন তাঁর অফিস থেকে এআই ভিডিও প্রকাশ করে আবার ডিলিট করা হচ্ছে? একই সঙ্গে তিনি হোয়াইট হাউসের তথাকথিত ‘আতঙ্ক’ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। হিব্রু ভাষাভাষী ব্যবহারকারীরাও সামাজিক মাধ্যমে লিখছেন, “নেতানিয়াহু কি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন?”
এআই চ্যাটবট ‘গ্রোক’ ও ফ্যাক্ট চেক
গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে এক্স-এর নিজস্ব এআই চ্যাটবট ‘গ্রোক’ (Grok) দ্রুত তদন্ত শুরু করে। গ্রোক এই দাবিগুলোকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। গ্রোকের মতে:
আরো পড়ুন
- আঙুলের সংখ্যা: অন্য সবার মতো নেতানিয়াহুরও প্রতি হাতে পাঁচটি করে আঙুল আছে।
- দৃষ্টিবিভ্রম: ভিডিওতে তিনি পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে যেভাবে হাত নাড়াচ্ছিলেন, ক্যামেরার বিশেষ অ্যাঙ্গেলের কারণে সেখানে একটি অপটিক্যাল ইলিউশন তৈরি হয়েছে।
- সত্যতা: ছবিটি কোনো এআই জেনারেটেড ভিডিও নয়, বরং একটি নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনের অংশ।
আরো পড়ুন: সৌদি যুবরাজের উসকানিতেই ইরানে হামলা চালিয়েছেন ট্রাম্প!
যুদ্ধের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ইরানের পরিস্থিতি
এই বিতর্কের নেপথ্যে রয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির একটি বড় ঘটনা। ওইদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আগ্রাসনের প্রথম দিনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে একটি বড় অংশের দাবি রয়েছে। যদিও এই তথ্যের সত্যতা নিয়ে এখনও বিভিন্ন মহলে বিতর্ক চলমান।
| ইভেন্ট | তারিখ | বর্তমান অবস্থা |
| খামেনির ওপর হামলা | ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | অসমর্থিত সূত্র অনুযায়ী দাবি |
| যুদ্ধ শুরু | ১ মার্চ, ২০২৬ | ১৫তম দিনে পদার্পণ |
| নেতানিয়াহুর ভাইরাল ভিডিও | ১৩ মার্চ, ২০২৬ | এআই বিতর্কের জন্ম |
ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহুর রহস্যময় নীরবতা
গুঞ্জনের পালে হাওয়া দিচ্ছে নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহুর নীরবতা। সাধারণত সামাজিক মাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয় থাকা ইয়ার গত ৯ মার্চের পর থেকে এক্সে কোনো নতুন পোস্ট দেননি। কোনো সংকটের সময় পরিবারের সদস্যদের এমন নীরবতা সাধারণত সাধারণ মানুষের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়।
একই সময়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের একটি সংবাদ সম্মেলন থেকে হুট করে চলে যাওয়া এবং ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে ‘ক্রেমলিন’ নামক একটি পেজ রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত এক গোলকধাঁধায় এখন নেট দুনিয়া।
কেন মানুষ এআই ভিডিওর সন্দেহ করছে?
বর্তমান যুগে ডিপফেক বা এআই ভিডিও এতটাই শক্তিশালী যে, আসল ও নকলের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নেতানিয়াহুর ৬ আঙুল থাকার দাবিটি মূলত এআই-এর সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণত এআই যখন মানুষের অবয়ব তৈরি করে, তখন হাতের আঙুল বা চোখের মণি নিখুঁত করতে হিমশিম খায়।
শেষ কথা
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল। এমন সময়ে বিশ্বনেতাদের নিয়ে কোনো খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নেতানিয়াহুর ভিডিওর এই অসংগতি স্রেফ ক্যামেরার কারসাজি নাকি এর পেছনে গভীর কোনো সত্য লুকিয়ে আছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
তবে পাঠকদের প্রতি অনুরোধ, ভেরিফায়েড সোর্স বা বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ মাধ্যম ছাড়া কোনো গুজবে কান দেবেন না। স্নোপস এবং টাইমস অব ইসরায়েলের মতো ফ্যাক্ট চেক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত এই গুজবগুলো খণ্ডন করার চেষ্টা করছে।
আমরা এই ঘটনার ওপর কড়া নজর রাখছি। নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলেই আপনাদের দ্রুত জানানো হবে। প্রযুক্তির এই যুগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান বিতর্ক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। প্রদত্ত তথ্যের কোনোটিই আমাদের ব্যক্তিগত মতামত নয়।













