---Advertisement---

রংপুরে ইতিহাস গড়ে এসএসসি পরীক্ষায় ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গ শিক্ষার্থী

April 27, 2026 8:16 PM
তৃতীয় লিঙ্গের ২৮ শিক্ষার্থী এসএসসিতে — রংপুরে ইতিহাস
---Advertisement---

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো রংপুরে। তৃতীয় লিঙ্গের ২৮ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রমাণ করলেন — শিক্ষার দরজা সবার জন্যই খোলা। সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক প্রত্যাখ্যান আর জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই পরীক্ষায় বসাটা তাদের কাছে শুধু একটি পরীক্ষা নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের লড়াইয়ের অংশ।

শুক্রবার সকাল ৯টায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসএসসি প্রোগ্রাম-২০২৬ পরীক্ষায় এই শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। তিন ঘণ্টার পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা জানান, এই মুহূর্তটি তাদের জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা।

২৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী এই পরীক্ষার্থীরা জানান, সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে তারা পড়াশোনায় ফিরে এসেছেন। অনেকেরই স্বপ্ন — উচ্চশিক্ষা, চাকরি কিংবা উদ্যোক্তা হওয়া। এই স্বপ্নগুলো আর শুধু স্বপ্ন নয়, এখন সেগুলো সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

আরো পড়ুন: নারীদের রান্নার কষ্ট লাঘবে প্রধানমন্ত্রীর নতুন উপহার ‘এলপিজি কার্ড’: কারা পাবেন এবং কী কী সুবিধা?

কে এই আনোয়ারা ইসলাম রানী — পরীক্ষার্থীদের ‘গুরু মা’

রংপুর নগরের আলমনগর নুরপুর এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারা ইসলাম রানী এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দু। ৩৩ বছর বয়সী রানী নিজেও এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। আইটি ও কম্পিউটারে দক্ষ এই নারী বছরের পর বছর ধরে তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

অন্য ২৭ জনের কাছে তিনি ‘গুরু মা’ — অনুপ্রেরণার উৎস। রানী বলেন, “এটি শুধু একটি পরীক্ষা নয়, আমাদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি। আমরা শিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই, সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।” তার কথায় স্পষ্ট — শিক্ষাই এই সমাজে তাদের টিকে থাকার হাতিয়ার।

আগে পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও নানা কারণে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হয়নি রানীর। এবার নিজে পরীক্ষার হলে বসে, পাশাপাশি অন্যদেরও সেই সুযোগ করে দিয়েছেন — এটিই তার সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরীক্ষার কেন্দ্র ও পরিসংখ্যান এক নজরে

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী রংপুর বিভাগের এই পরীক্ষার বিস্তারিত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:

বিষয়তথ্য
পরীক্ষার নামএসএসসি প্রোগ্রাম-২০২৬
পরীক্ষা কর্তৃপক্ষবাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
রংপুর বিভাগে মোট কেন্দ্র৯টি
রংপুর বিভাগে মোট পরীক্ষার্থী১,১৩২ জন
তৃতীয় লিঙ্গের পরীক্ষার্থীর কেন্দ্রপায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মিঠাপুকুর
উক্ত কেন্দ্রে মোট পরীক্ষার্থী১৫৯ জন
তৃতীয় লিঙ্গের পরীক্ষার্থী২৮ জন
শিক্ষার্থীদের বয়সসীমা২৮–৪০ বছর

আরো পড়ুন: রংপুরে ১১টির মধ্যে ৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ: জ্বালানি সংকটে অন্ধকারে ৮ জেলার লাখো মানুষ

কী বললেন কেন্দ্রের প্রধান শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ

পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মাহেদুল আলম জানান, পরীক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, একসঙ্গে ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ তাদের কেন্দ্রের জন্য সত্যিই ব্যতিক্রমী এবং গর্বের বিষয়।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রংপুর আঞ্চলিক পরিচালক আবু হাফিজ মো. ফজলে নিজামি জানান, যেন কোনো ধরনের বৈষম্য না ঘটে সেটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, “শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার। লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে কেউ যাতে বঞ্চিত না হয়, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”

হিজড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার কারণ কী?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা — যাদের অনেকে হিজড়া সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত — দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। এর পেছনে যে কারণগুলো কাজ করে সেগুলো হলো:

  • পারিবারিক প্রত্যাখ্যান: শৈশবেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া
  • সামাজিক কলঙ্ক: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হেয় করা বা উপহাস
  • আর্থিক অনিশ্চয়তা: জীবিকার জন্য ভিক্ষা বা অন্যান্য কাজে নির্ভরতা
  • প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের অভাব: ট্রান্সজেন্ডার-বান্ধব শিক্ষা পরিবেশের ঘাটতি
  • মানসিক চাপ: দীর্ঘমেয়াদী বৈষম্যের কারণে আত্মবিশ্বাসের অভাব

তবে সরকার ২০১৩ সালে তৃতীয় লিঙ্গকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিবর্তনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

আরো পড়ুন: রংপুর শিশু হাসপাতাল: ৩১ কোটি টাকার ভবন পড়ে আছে, ৬ বছরেও চালু হয়নি সেবা

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পথে বাংলাদেশ

সরকারি উদ্যোগ কতটা কাজে আসছে?

সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদরা মনে করেন, শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হয় না — বাস্তবায়নটাও গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন:

  • নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ পরিবেশ যেখানে বৈষম্যের কোনো সুযোগ নেই
  • মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং সুবিধা
  • বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা যা তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে
  • কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাস করার পর যাতে বৈষম্যের শিকার না হতে হয়

রংপুরের এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে, সঠিক পরিবেশ ও অনুপ্রেরণা থাকলে তারাও মূলধারার শিক্ষায় যুক্ত হতে পারেন।

ট্রান্সজেন্ডার শিক্ষার্থীদের সাফল্য কি টেকসই হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের উপর। শুধু পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিলেই হয় না — সনদ পাওয়ার পর চাকরির বাজারে যাতে তারা সমান সুযোগ পান, সেটি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা অর্জনের পরের ধাপটিই সবচেয়ে কঠিন — এবং সেখানে প্রয়োজন আরও দৃঢ় নীতিগত সমর্থন।

পরীক্ষার্থীরা কী বলছেন 📢

পরীক্ষা শেষে বেরিয়ে এসে অনেক শিক্ষার্থী অনুভূতি ভাগ করে নেন। তাদের কথায় উঠে আসে গর্ব, আনন্দ এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা। একজন বলেন, “আমি ভাবিনি এই বয়সে আবার পরীক্ষার হলে বসব। কিন্তু আজ বসেছি — এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।” আরেকজন জানান, পরীক্ষা পাস করে তিনি একটি ছোট ব্যবসা শুরু করতে চান, যাতে আর কাউকে ভিক্ষার উপর নির্ভর করতে না হয়।

এদের স্বপ্নগুলো ছোট নয়। এরা চান উচ্চশিক্ষা, চাকরি, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ — এবং সবার আগে চান সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার।

আরো পড়ুন: দড়ি-বাঁশ ধরে মসজিদে যাওয়া সেই অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লা আর নেই — ১২০ বছর বয়সে ইন্তেকাল

শেষ কথা

রংপুরের পায়রাবন্দ কেন্দ্রে এই ২৮ জনের পরীক্ষায় বসা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। 🎓 এটি হলো বছরের পর বছর ধরে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষগুলোর বিজয়ের গল্পের একটি অধ্যায়। তারা প্রমাণ করেছেন — ইচ্ছা, পরিশ্রম আর সঠিক সুযোগ পেলে জীবনের যেকোনো পর্যায়েই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশকে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এই ধরনের উদ্যোগকে আরও বড় আকারে, আরও বেশি জেলায় ছড়িয়ে দিতে হবে। রংপুরের এই মডেল অন্যান্য বিভাগের জন্যও অনুসরণযোগ্য হতে পারে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা সমাজের বোঝা নন — তারাও এই সমাজের সদস্য, এবং তাদের মেধা ও শ্রমকে মূল্য দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

এই বিষয়ে আপনার মতামত কমেন্টে জানান। jugeralo.com-এ আরও সমসাময়িক খবর ও বিশ্লেষণ পেতে পেজটি বুকমার্ক করুন এবং বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন। 📲

⚠️ Disclaimer: এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যসমূহ বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। jugeralo.com কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক অবস্থান সমর্থন করে না। এই নিউজ সম্পূর্ণ তথ্যভিত্তিক এবং সকল মানুষের সমান অধিকারের পক্ষে।

Juger Alo Facebook Pageযুগের আলো’র সর্বশেষ খবর পেতে Facbook Page অনুসরণ করুন

Juger Alo

যুগের আলো — নতুন তথ্যের নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। আমরা শিক্ষা, ক্যারিয়ার, সর্বশেষ প্রযুক্তি এবং সমসাময়িক খবরের সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ আপডেট পৌঁছে দিই সবার আগে। সঠিক তথ্যে নিজেকে আপডেট রাখতে আমাদের সাথেই থাকুন।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now