রংপুর বিভাগে মোট ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭টি এখন পুরোপুরি বন্ধ। জ্বালানি তেলের সংকট, কয়লার অভাব এবং যান্ত্রিক ত্রুটি — এই তিন কারণে একের পর এক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ও তার সাথে প্রচন্ড তাপদাহের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বিভাগের আট জেলার কোটিরও বেশি মানুষ। প্রতি এক ঘণ্টায় একবার করে বিদ্যুৎ যাচ্ছে, থাকছে না কৃষি, শিল্প বা ব্যবসা — কোনো খাতই।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা নেসকোর রংপুর বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় লোডশেডিং দিয়ে পরিস্থিতি সামলানো হচ্ছে। তবে কবে স্বাভাবিক হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
কোন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ আছে?
রংপুর বিভাগের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ভরসা ছিল বড় পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কিন্তু কয়লাসংকট ও যান্ত্রিক সমস্যায় কেন্দ্রটির তিনটি ইউনিটই এখন বন্ধ। এই তিনটি ইউনিট মিলিয়ে উৎপাদন ছিল ২৭৫ মেগাওয়াট। কবে নাগাদ চালু হবে, তা এখনো কেউ বলতে পারছেন না।
আরো পড়ুন: ভারতকে ‘নরকের কুঠুরি’ কটাক্ষ ট্রাম্পের, দিল্লির কড়া প্রতিবাদ
নিচে বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চিত্র একনজরে দেখা যাক:
| বিদ্যুৎকেন্দ্র | সক্ষমতা | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|
| বড় পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ (৩ ইউনিট) | ২৭৫ মেগাওয়াট | সম্পূর্ণ বন্ধ |
| পিডিবি পার্বতীপুর | ১৬০ মেগাওয়াট | বন্ধ |
| সৈয়দপুর (বড় কেন্দ্র) | ১৫০ মেগাওয়াট | বন্ধ |
| সৈয়দপুর (ছোট কেন্দ্র) | ২০ মেগাওয়াট | বন্ধ |
| রংপুর | ২০ মেগাওয়াট | বন্ধ |
| কনফিডেন্স পাওয়ার, রংপুর | ১১৩ মেগাওয়াট | ২০–২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন |
| ঠাকুরগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্র | ১১৩ মেগাওয়াট | সক্ষমতার ৪০% এর কম উৎপাদন |
যেসব কেন্দ্র এখনো চালু আছে, সেগুলো সক্ষমতার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে। এই পরিস্থিতি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ ফেলছে।
জ্বালানি সংকটই মূল কারণ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকটের আঁচ এসে পড়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতেও। তেলের অভাবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে বড় পুকুরিয়ায় কয়লার যোগান না থাকায় কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রও উৎপাদনে নেই। এছাড়া পুরোনো যন্ত্রপাতির ঘন ঘন ত্রুটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
আরো পড়ুন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান নয়, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জ্বালানি বৈচিত্র্য না আনলে এই সংকট বারবার ফিরে আসবে।
আরো পড়ুন: ২০০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা ও শক্তিশালী ব্যাটারি নিয়ে হাজির ওপ্পোর নতুন চমক
চাহিদা ও সরবরাহের ফারাক কতটা?
রংপুর বিভাগের আট জেলায় বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ৮৫০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে বরাদ্দ মিলছে মাত্র ৭০০ থেকে ৭২০ মেগাওয়াট। ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় শ মেগাওয়াটে।
নেসকো সূত্রে জানা গেছে, এই বিভাগের যে আট জেলায় সরবরাহ ঘাটতি চলছে সেগুলো হলো:
- রংপুর
- কুড়িগ্রাম
- লালমনিরহাট
- নীলফামারী
- গাইবান্ধা
- দিনাজপুর
- ঠাকুরগাঁও
- পঞ্চগড়
এই জেলাগুলোর অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহই করা সম্ভব হচ্ছে না বলে স্বীকার করেছে নেসকো কর্তৃপক্ষ। পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা হচ্ছে।
⚡ তাপদাহের মধ্যে লোডশেডিং — জনজীবন বিপর্যস্ত
গত কয়েকদিন ধরে রংপুরসহ সারাদেশে তীব্র তাপদাহ চলছে। এর মধ্যে প্রতি এক ঘণ্টায় একবার করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। দোকানপাট ও কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি সেচেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। হিমাগারে রাখা পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং সমাধানের পথ
নেসকোর রংপুর বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদামতো বরাদ্দ না পাওয়াই লোডশেডিংয়ের প্রধান কারণ। পর্যায়ক্রমে শেডিং দিয়ে সর্বত্র কিছুটা হলেও বিদ্যুৎ পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কবে চালু হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং যান্ত্রিক মেরামত সম্পন্ন না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আরো পড়ুন: মনে শান্তি নেই? হতাশা ও দুশ্চিন্তা দূর করতে কুরআনের এই ১০ আয়াত পড়ুন
শিল্প ও কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কা
এই সংকট শুধু গৃহস্থালির অসুবিধায় থেমে নেই। দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্সের নেতারা জানাচ্ছেন, চালকলসহ কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। 🌾
বোরো মৌসুমে সেচের জন্য বিদ্যুৎনির্ভর পাম্পগুলো সচল না থাকলে ফসলের উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষিবিদরা। একইসাথে ক্ষুদ্র শিল্প ও হিমাগার ব্যবসায়ীরাও কোটি টাকার ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে।
সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, হাসপাতাল রোগী এবং পরীক্ষার্থীরাও এই পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে।
শেষ কথা
রংপুর বিভাগে বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতা, পুরোনো যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা — এই তিনটি সমস্যা একসাথে আঘাত করেছে।
সাধারণ মানুষ চাইছে দ্রুত সমাধান। কর্তৃপক্ষের উচিত বন্ধ কেন্দ্রগুলো সচল করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া এবং বিকল্প জ্বালানি সংস্থানের পথ খোলা। একই সাথে দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
এই খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে বন্ধু ও পরিবারের সাথে শেয়ার করুন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পেতে আমাদের ওয়েবসাইট বুকমার্ক করে রাখুন। 🔖
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি নেসকো কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সূত্র এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল, তাই সর্বশেষ আপডেটের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করুন।











