পবিত্র মাহে রমজানকে সামনে রেখে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে উপহার হিসেবে দেওয়া খেজুর দেশের প্রতিটি জেলায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, রংপুর জেলার আটটি উপজেলায় এই উপহার বিতরণ করা হলেও সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছে রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকার কয়েক লাখ হতদরিদ্র মানুষ।
একই জেলায় বসবাস করেও শহর ও গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই বিশাল বৈষম্য তৈরি হওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, রংপুর সিটি কর্পোরেশন কি তবে প্রশাসনের বিশেষ নজরদারি থেকে অবহেলিত?
বুধবার (১১ মার্চ) দুপুরে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যে এই চাঞ্চল্যকর বঞ্চনার চিত্র ফুটে উঠেছে। যেখানে জেলার প্রতিটি উপজেলার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সেখানে সিটি কর্পোরেশন এলাকার জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ না থাকা প্রশাসনের বড় ধরণের সমন্বয়হীনতা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরো পড়ুন: রংপুরে নির্মিত হচ্ছে অত্যাধুনিক বিভাগীয় স্টেডিয়াম: ১৫ একর জমির ওপর দ্রুত কাজ শুরুর ঘোষণা
৮ উপজেলায় উৎসব, সিটি কর্পোরেশনে হাহাকার
সৌদি আরবের কিং সালমান হিউম্যানিটারিয়ান এইড অ্যান্ড রিলিফ সেন্টারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে মোট ১২ হাজার ৫০০ কার্টুন খেজুর উপহার দেওয়া হয়েছে। এই উপহারের মূল উদ্দেশ্য ছিল রমজান মাসে দেশের দুস্থ ও অসহায় মানুষের ইফতারিতে সহায়তা করা। সরকারের পক্ষ থেকে এই খেজুর দেশের প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
রংপুর জেলার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে প্রায় ২০১ কেজি (মতান্তরে কার্টুন ভিত্তিক হিসাব ভিন্ন হতে পারে) খেজুর। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, এই বরাদ্দের পুরো অংশই ভাগ করে দেওয়া হয়েছে জেলার আটটি উপজেলার জন্য। রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকার দরিদ্র মানুষ, ভাসমান জনগোষ্ঠী এবং অসংখ্য এতিমখানার জন্য একটি কার্টুন খেজুরও বরাদ্দ রাখা হয়নি।
প্রশাসনের বক্তব্য: দায় কার?
এ বিষয়ে জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় জেলার আটটি উপজেলার জন্য এই খেজুর বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কাছে ইতিমধ্যে এই খেজুর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা নিজ নিজ এলাকার মাদরাসা ও এতিমখানায় এগুলো বিতরণ করবেন। তবে কেন সিটি কর্পোরেশন এলাকা বাদ পড়ল, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর মেলেনি।
অন্যদিকে, রংপুর সিটি কর্পোরেশন-এর প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম সরাসরি বঞ্চনার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “খেজুর সরাসরি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের জন্য আলাদা করে কোনো বরাদ্দ আমাদের কাছে আসেনি। এমনকি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সিটির দরিদ্রদের জন্য কোনো খেজুর দেওয়া হয়নি।”
আরও পড়ুন: সরকারি অনুদান হিসেবে সারা দেশে যাচ্ছে সৌদি আরবের উপহারের খেজুর: দেখুন আপনার জেলায় কতটুকু
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও সচেতন মহলের প্রতিক্রিয়া
এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নগরীর বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। নগরীর প্রাণকেন্দ্রের একজন বাসিন্দা বলেন, “শহরের ভেতরেও হাজার হাজার মানুষ বস্তিতে বসবাস করে, রেলওয়ে স্টেশনে রাত কাটায়। এছাড়া সিটির ভেতরে অসংখ্য বড় বড় এতিমখানা ও মাদরাসা রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে খেজুর গেলে সিটির মানুষ কেন পাবে না? আমরা কি তবে এই জেলার বাইরের কেউ?”
সচেতন মহলের মতে, এটি কেবল একটি খেজুরের বিষয় নয়; বরং এটি হলো সুষম বণ্টনের অভাব। রংপুর সিটি কর্পোরেশন একটি বিশাল এলাকা। এখানকার দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও কম নয়। ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে এমন দেয়াল তৈরি করা মোটেও কাম্য নয়।
সমন্বয়হীনতার মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা প্রশাসন এবং সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে কাজের যথাযথ সমন্বয় না থাকলেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সরকারের পক্ষ থেকে যখন কোনো ‘সেন্ট্রাল’ অনুদান আসে, তখন সেটি জেলার মোট জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে বরাদ্দ করা হয়। সেখানে সিটি কর্পোরেশনকে আলাদা করে না দেখা বা ভুলে যাওয়া প্রশাসনের অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়।
ভবিষ্যতে এ ধরনের মানবিক সহায়তা বিতরণের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমতা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকার দরিদ্র মানুষ ও এতিমখানাগুলোকেও এই ধরণের সহায়তার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, সৌদি আরবের এই উপহার ছিল একটি ভ্রাতৃত্বের নিদর্শন। কিন্তু সেই উপহার যখন সুষমভাবে বণ্টিত হয় না, তখন তা সাধারণ মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকার অসহায় মানুষগুলো যে আজ বঞ্চিত হলো, তার দায়ভার প্রশাসনকে নিতেই হবে। একটি আধুনিক ও ডিজিটাল সিটি কর্পোরেশন গড়ার লক্ষ্যে কাজ করলেও ত্রাণ বিতরণের এই বৈষম্য উন্নয়নের পথে একটি বড় কাঁটা।
আমরা আশা করি, জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে এবং পরবর্তীতে যেকোনো ধরণের সরকারি অনুদান বা ত্রাণ বিতরণের সময় সিটি কর্পোরেশন এলাকার মানুষের কথা মাথায় রাখবে। এতিম শিশু ও দুস্থদের হক যেন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নষ্ট না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
রংপুরের নাগরিক হিসেবে আপনার এলাকার কোনো বঞ্চনা বা অনিয়মের খবর থাকলে আমাদের কমেন্ট করে জানান। এই সংবাদটি শেয়ার করে অন্যদেরও জানার সুযোগ করে দিন। আপনার জেলার প্রতিটি আপডেট পেতে আমাদের ওয়েবসাইটটি নিয়মিত ভিজিট করুন।
Disclaimer: এই সংবাদটি স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সিটি প্রশাসকের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে। বরাদ্দের কোনো পরিবর্তন হলে তা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হবে।











