ছাত্র রাজনীতি ও নির্বাচন ২০২৬: বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির চিরচেনা সমীকরণ এক নিমিষেই ওলটপালট হয়ে গেছে। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পর সর্বশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জকসু) নির্বাচনেও ভিপি-জিএসসহ প্রায় সবকটি শীর্ষ পদে জয়ী হয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীরা।
যে সংগঠনটি দীর্ঘ দেড় দশক ক্যাম্পাসে কার্যত ‘নিষিদ্ধ’ বা ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ অবস্থায় ছিল, তাদের এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন এখন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এটি কি কেবলই সময়ের দাবি, নাকি এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল কোনো মাস্টারপ্ল্যান?
আজকের গভীরে অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে আমরা উন্মোচন করব সেই সত্যগুলো, যা এই অভাবনীয় বিজয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।
আরো পড়ুন: ভারতে পলাতক ওবায়দুল কাদের হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন গোপন আস্তানায়, অবস্থা সংকটাপন্ন
১. প্রথাগত রাজনীতির প্রতি ঘৃণা ও ‘নিউ জেনারেশন’ মনস্তত্ত্ব
বিগত ১৬ বছর বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত ‘টর্চার সেল’ বা নিপীড়নের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগকে দেখেছে ভয় ও আতঙ্কের চোখে।
অন্যদিকে, ক্ষমতার পালাবদলের পর অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোও যখন হলে সিট দখল বা প্রভাব বিস্তারের পুরোনো পথে হাঁটতে শুরু করে, তখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের তীব্র অনাস্থা তৈরি হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান জেন-জি (Gen-Z) শিক্ষার্থীরা এমন নেতৃত্ব চায় যারা তাদের ওপর মাসল পাওয়ার দেখাবে না। শিবিরের দীর্ঘ অনুপস্থিতি তাদের জন্য একটি ‘ক্লিন ইমেজ’ বা স্বচ্ছ ভাবমূর্তি তৈরি করেছে।
শিক্ষার্থীরা ভেবেছে—পুরোনোদের তো দেখলাম, এবার নতুন কাউকে সুযোগ দিয়ে দেখা যাক। এই “টেস্ট কেস” মানসিকতাই শিবিরের বাক্সে ভোটের জোয়ার এনেছে।
২. ‘ছদ্মবেশী’ রাজনীতি ও অক্ষুণ্ণ সাংগঠনিক কাঠামো
আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর দমনের মুখে ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য রাজনীতি করতে না পারলেও তাদের সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েনি।
আরো পড়ুন
অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস এর মতে, শিবির কর্মীরা নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী বা এমনকি অন্য সংগঠনের ভেতরে ঢুকেও তাদের কাজ চালিয়ে গেছে।
যখন ছাত্রদল বা বাম দলগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা সাংগঠনিক দুর্বলতায় ভুগছিল, শিবির তখন ভেতরে ভেতরে প্রতিটি হলের প্রতিটি রুমে তাদের নেটওয়ার্ক মজবুত করেছে।
৫ আগস্টের পর তারা যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন দেখা যায় তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ ‘রেডি-মেড’ কর্মী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। এই গোপন প্রস্তুতির কারণেই নির্বাচন ঘোষণার পর তারা প্রচারণায় অন্যদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে ছিল।
আরো পড়ুন: সব চেষ্টা ব্যর্থ—আজ ভোর ৬টায় না ফেরার দেশে চলে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া
৩. ‘ওয়েলফেয়ার পলিটিক্স’ বা ছাত্রবান্ধব কর্মসূচি
শিবিরের এবারের নির্বাচনী কৌশল ছিল অত্যন্ত আধুনিক। তারা কেবল মিছিলে লেজুড়বৃত্তি করার রাজনীতি নয়, বরং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত উন্নতির ওপর জোর দিয়েছে। তাদের ইশতেহারে ছিল:
- ক্যাম্পাসে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
- ক্যারিয়ার গাইডলাইন ও আইটি স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম।
- সেশনজট কমানোর জন্য প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি।
- হলের ক্যান্টিনে খাবারের মান উন্নয়ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সামিয়া জামান বলেন, “শিক্ষার্থীরা এখন আর বড় আদর্শিক বুলি শুনতে চায় না, তারা চায় তাদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান।”
শিবির প্রার্থীরা নিজেদের ‘ভদ্র’ এবং ‘ছাত্রবান্ধব’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থায় নিতে সহায়ক হয়েছে।
৪. জুলাই অভ্যুত্থানের ইমেজ ও সমন্বয়ক ফ্যাক্টর
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে শিবিরের নেতাকর্মীদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। পতনের পর এই আন্দোলনের পুরো কৃতিত্ব বা ‘লেগাসি’ নিজেদের দিকে টানতে তারা সফল হয়েছে।
বিশেষ করে অনেক প্রভাবশালী সমন্বয়কের সাথে শিবিরের প্রচ্ছন্ন যোগাযোগ এবং রাজপথের লড়াইয়ের সুবাদে তারা একটি ‘বিপ্লবী’ ইমেজ লাভ করে। অনেক ভোটার মনে করেছেন, রাজপথে যারা বুক পেতে দিয়েছিলে, তারাই ক্যাম্পাসের নেতৃত্বে আসা উচিত। এই আবেগটি ভোটের মাঠে দারুণভাবে কাজ করেছে।
৫. জামায়াতে ইসলামীর মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট ও রিসোর্স
শিবিরের এই জয়ের পেছনে তাদের মাদার অর্গানাইজেশন জামায়াতে ইসলামীর বিশাল ভূমিকা রয়েছে। নুরুল হক নুরের মতে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনকে জামায়াত তাদের জাতীয় রাজনীতির ‘ট্রায়াল রান’ হিসেবে নিয়েছে।
প্রতিটি প্রার্থীর জন্য আলাদা সোশ্যাল মিডিয়া উইং, পোস্টার ডিজাইন থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নানা সুযোগ-সুবিধা বা স্কলারশিপের প্রলোভন—সবকিছুই ছিল একটি সুপরিকল্পিত কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অংশ। তাদের পেশাদার প্রচারণার সামনে অন্য সংগঠনগুলো অনেকটা অপেশাদার প্রমাণিত হয়েছে।
পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনী ফলাফলের চিত্র
| বিশ্ববিদ্যালয় | নির্বাচনের নাম | ভিপি/জিএস পদ | বিশেষ ফলাফল |
| জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় | জকসু | ভিপি, জিএস (শিবির) | ১৬টি পদ লাভ |
| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | ডাকসু | ভিপি, জিএস (শিবির সমর্থিত) | সাইলেন্ট ভোটারদের জয় |
| চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় | চাকসু | শীর্ষ প্রায় সব পদ | সাংগঠনিক শক্ত ভিত্তি |
| রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় | রাকসু | ভিপি (শিবির সমর্থিত) | আধিপত্যবিরোধী ঐক্য জয়ী |
| জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় | জাকসু | জিএস ও এজিএস (শিবির) | সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমর্থন |
তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন: ডানপন্থার উত্থান?
বিশ্বজুড়ে এখন রক্ষণশীল বা ডানপন্থী রাজনীতির একটি নতুন প্রবাহ বইছে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মও এর বাইরে নয়। গত কয়েক বছরে সেক্যুলার বা লিবারেল রাজনীতির প্রতি এক ধরনের বিরূপ ধারণা তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
তারা এখন নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে মিলে এমন নেতৃত্বকে বেশি ভরসা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শিবিরের জয় কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
শেষ কথা: এটি কি স্থায়ী বিজয়?
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিবিরের এই জয় জয়কার বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তবে এই বিজয় ধরে রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষার্থীরা তাদের ওপর যে বিশাল আস্থার বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে, তা পূরণ করতে না পারলে খুব দ্রুতই এই জনপ্রিয়তা ধসে পড়তে পারে। ক্যাম্পাসে বৈচিত্র্য বজায় রাখা এবং ভিন্নমতের অনুসারীদের ওপর কোনো ধরণের চাপ সৃষ্টি না করার মাধ্যমেই তারা প্রমাণ করতে পারবে যে তারা আসলে ‘পুরোনো রাজনীতি’ থেকে কতটা আলাদা।
২০২৬ সালের এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে—ক্যাম্পাসে এখন আর পেশীশক্তি নয়, বরং সেবার রাজনীতিই টিকে থাকার মূলমন্ত্র।











