---Advertisement---

রংপুরে পরীক্ষা কেন্দ্রেই ভেঙে গেল জান্নাতুলের স্বপ্ন

April 22, 2026 7:49 PM
রংপুরের মিঠাপুকুরে পরীক্ষার এডমিট কার্ড না পাওয়ায় দাখিল পরীক্ষার্থী জান্নাতুলের কান্না ও স্বপ্নভঙ্গের দৃশ্য- Juger Alo
---Advertisement---

যুগের আলো ডেস্ক: মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকালে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। আলিম মাদরাসা কেন্দ্রে প্রবেশপত্র বা পরীক্ষার এডমিট কার্ড না আসায় দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিতে না পেরে স্বপ্ন জান্নাতুল ফেরদৌস নামের এক মেধাবী শিক্ষার্থী। রিকশাচালক বাবার তিল তিল করে জমানো অর্থে ফরম পূরণ করেও শেষ মুহূর্তে পরীক্ষায় বসতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়ে জান্নাতুল।

বুজরুক সন্তোষপুর কারামতিয়া ফাজিল মাদরাসার বিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার। কিন্তু মাদরাসা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি আর অনিয়মের কারণে পরীক্ষার দিন কেন্দ্র থেকে তাকে ফিরে আসতে হয়েছে। এই ঘটনাটি বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে জান্নাতুলের অভিযোগ, অন্য সব সহপাঠী তাদের প্রবেশপত্র হাতে পেলেও রহস্যজনকভাবে কেবল তার কার্ডটিই আসেনি। এ নিয়ে কেন্দ্র সচিব ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে পাওয়া গেছে নানা অসঙ্গতি। 🎒

আরো পড়ুন: ট্যাক্স-ফ্রি নয়, সরকারি গাড়ি চেয়েছি, আমার বক্তব্য ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে : হাসনাত আবদুল্লাহ

স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার, বাধা হয়ে দাঁড়ালো প্রবেশপত্র

জান্নাতুল ফেরদৌসের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার বালুয়া মাসুমপুর ইউনিয়নের সন্তোষপুর হাচিয়া গ্রামে। তার বাবা জিয়াউর রহমান একজন সাধারণ রিকশাচালক। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালানো ছিল এক বিরাট যুদ্ধ।

তবুও মেয়ের প্রবল ইচ্ছার কাছে হার মেনে রিকশাচালক বাবা কষ্টের টাকায় মেয়ের এসএসসি দাখিল পরীক্ষা ২০২৬ এর ফরম পূরণ করেছিলেন। জান্নাতুলও দিনরাত পরিশ্রম করে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো আত্মস্থ করতে। কিন্তু পরীক্ষার সকালে যখন তার হাতে কলম থাকার কথা, তখন তার দুচোখ দিয়ে ঝরছিল নোনা জল।

জান্নাতুল জানায়, পরীক্ষার ঠিক আগ মুহূর্তে সহপাঠীরা তাদের প্রবেশপত্র পেলেও তাকে কোনো কার্ড দেওয়া হয়নি। এমনকি প্রবেশপত্রের নাম করে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

অনিয়মের বেড়াজালে বন্দি পরীক্ষার এডমিট কার্ড

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর দাবি অনুযায়ী, পরীক্ষার কয়েক দিন আগেই অন্য সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কার্ড দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের মাদরাসার ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে গিয়ে ৫০০ টাকা দাবি করা হয় প্রবেশপত্রের বিনিময়ে।

সব শিক্ষার্থী টাকা দিয়ে কার্ড সংগ্রহ করতে পারলেও জান্নাতুলের নাম সেখানে ছিল না। মূলত শিক্ষা বোর্ডে ফরম পূরণ প্রক্রিয়ায় কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অবহেলা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, এটি নিছক কোনো ভুল নয়, বরং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।

আরো পড়ুন: ডিজেলের প্রভাবে এলপিজিতে অস্থিরতা: চলতি মে মাসে দ্বিতীয় দফায় বাড়ল গ্যাসের দাম

কেন জান্নাতুল পরীক্ষা দিতে পারল না?

কারণসমূহবিস্তারিত তথ্য
সময়মতো ফরম পূরণপরিবারের দাবি, তারা ২ হাজার ৩০০ টাকা পরিশোধ করেছেন।
প্রবেশপত্র বিতরণঅন্য ছাত্রীরা পেলেও জান্নাতুলের কার্ডটি কেন্দ্রে পৌঁছায়নি।
কর্তৃপক্ষের ভূমিকাশেষ মুহূর্তে সমস্যার সমাধান না করে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
আর্থিক লেনদেনঅভিযোগ উঠেছে কার্ড দেওয়ার নাম করে অবৈধভাবে ৫০০ টাকা চাওয়া হয়েছে।

মা-বাবার আর্তনাদ: “এক বছরের ক্ষতি কি দুই হাজার টাকায় পূরণ হবে?”

জান্নাতুলের মা এসমোতারা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “মেয়ের ফরম পূরণের জন্য ৩ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। আমরা অনেক কষ্টে ২ হাজার ৩০০ টাকা যোগাড় করে দিয়েছি। একবেলা না খেয়ে সেই টাকা জমিয়েছি।”

মেয়ের স্বপ্নভঙ্গের পর মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাদরাসার দফতরি ও শিক্ষকরা জান্নাতুলকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তার মাকে ২ হাজার টাকা দিয়ে বিষয়টি মিমাংসা করার প্রস্তাব দেন।

কিন্তু এসমোতারার প্রশ্ন স্পষ্ট— “টাকা দিয়ে কী হবে? তারা ২ হাজার কেন, ২ লাখ টাকা দিলেও কি আমার মেয়ের জীবনের একটি বছর ফিরিয়ে দিতে পারবে? আমার মেয়ের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন তো আজ শেষ হয়ে গেল।” এই শিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহিতা নিয়ে এখন সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধছে।

আরো পড়ুন: গোপনে আপনার লোকেশন ট্র্যাক হচ্ছে কিনা জানেন? না জানলেই বিপদ!- এখনই চেক করুন

মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের বক্তব্য

বুজরুক সন্তোষপুর কারামতিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ এ কে মোনায়েম সরকার এই ঘটনার দায় পুরোপুরি স্বীকার করেননি। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি আগে থেকে তার জানা ছিল না। তবে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে, কেন ফরম পূরণ হয়নি তা খতিয়ে দেখা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অধ্যক্ষ জান্নাতুলকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, আগামী বছর পরীক্ষা দিলে সব খরচ মাদরাসা বহন করবে। তবে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ক্ষতি কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে মেটানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

অন্যদিকে, মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. পারভেজ বলেন, “আমরা বিষয়টি সাংবাদিকদের মাধ্যমে জেনেছি। তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, যদি পরীক্ষার শুরুর মুহূর্তেও বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হতো, তবে বিকল্প ব্যবস্থায় পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকত।

শেষ কথা

জান্নাতুল ফেরদৌসের এই কান্না কেবল একজন শিক্ষার্থীর কান্না নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে থাকা ফাটলের বহিঃপ্রকাশ। রিকশাচালক বাবার ঘামে ভেজা টাকা যখন দুর্নীতির কাছে হেরে যায়, তখন ভেঙে যায় একটি সুন্দর আগামীর স্বপ্ন।

আমরা আশা করি, উচ্চতর কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখবে। জান্নাতুল যেন তার কাঙ্ক্ষিত পরীক্ষা দিতে পারে এবং তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট না হয়, সেটাই এখন সকলের কাম্য। সমাজ ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধ করতে। ⚖️

যদি আপনিও মনে করেন জান্নাতুলের প্রতি অন্যায় হয়েছে, তবে এই প্রতিবেদনটি শেয়ার করে কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে সহায়তা করুন। আমাদের সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব আমাদেরই।

ডিসক্লেইমার: এই প্রতিবেদনটি একটি সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তথ্যের কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হলো। এটি কেবল সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রকাশিত।

Juger Alo Facebook Pageযুগের আলো’র সর্বশেষ খবর পেতে Facbook Page অনুসরণ করুন

Juger Alo

যুগের আলো — নতুন তথ্যের নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। আমরা শিক্ষা, ক্যারিয়ার, সর্বশেষ প্রযুক্তি এবং সমসাময়িক খবরের সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ আপডেট পৌঁছে দিই সবার আগে। সঠিক তথ্যে নিজেকে আপডেট রাখতে আমাদের সাথেই থাকুন।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now