নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার সেই আলোচিত অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লা আর নেই। রোববার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নিজ বাসভবনে ১২০ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দৃষ্টিহীন হওয়া সত্ত্বেও একাই দড়ি ও বাঁশ ধরে মসজিদে গিয়ে আজান দেওয়ার অদম্য সাধনায় তিনি সারা দেশের মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন।
অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লার ইন্তেকাল। রোববার, ৫ এপ্রিল ২০২৫, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা। নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বড়দেহা গ্রামে নিজ বাসভবনে। বার্ধক্যজনিত কারণে স্বাভাবিক মৃত্যু, বয়স ছিল ১২০ বছর।
সোমবার (৬ এপ্রিল) সকাল ৯টায় বড়দেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর স্থানীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জানাজায় এলাকার বহু মানুষ অংশ নেন, যা তাঁর প্রতি মানুষের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রমাণ।
আরো পড়ুন: সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেপ্তার — ধানমন্ডি থেকে আটক, ডিবিতে চলছে জিজ্ঞাসাবাদ
কে ছিলেন আব্দুর রহমান মোল্লা?
আব্দুর রহমান মোল্লা নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। ১২০ বছরের দীর্ঘ জীবনে তিনি অনেক কিছু দেখেছেন, সহ্য করেছেন — কিন্তু ধর্মের পথ থেকে এতটুকু সরে যাননি।
মরহুমের ছেলে, স্কুলশিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম সাইফুল জানিয়েছেন, প্রায় ২২ বছর আগে একটি দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারান। সেই ক্ষতি তাঁকে ভেঙে ফেলতে পারেনি — বরং তিনি আরও শক্ত মনে ধর্মের পথে নিজেকে সঁপে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
দৃষ্টি হারানোর কিছু বছর পর বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পবিত্র হজ পালন করেন। হজ থেকে ফেরার পর তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে — ইসলামের সেবায় নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করা।
দড়ি-বাঁশের পথ — ঈমানের এক অসাধারণ গল্প
হজ থেকে ফিরে আব্দুর রহমান মোল্লা একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। নিজের ৫ শতাংশ জমিতে একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করেন এবং সেই জমি মসজিদের নামেই রেজিস্ট্রি করে দেন। শুধু তাই নয়, নিজেই সেই মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু বাধা ছিল একটাই — বাড়ি থেকে মসজিদের দূরত্ব প্রায় ২০০ মিটার, আর তিনি দেখতে পান না। অনেকে হয়তো এখানেই থেমে যেতেন। কিন্তু আব্দুর রহমান মোল্লা থামেননি।
আরো পড়ুন
যেভাবে তৈরি হলো সেই অনন্য পথ:
তাঁর নির্দেশে সন্তানেরা বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তার পাশে দড়ি ও বাঁশ টাঙিয়ে দেন। প্রথম দিকে নাতিদের সহযোগিতায় পথটি আয়ত্ত করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি একাই — শুধু একটি লাঠি আর সেই দড়ি-বাঁশ অবলম্বন করে — প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে যেতে শুরু করেন।
দীর্ঘ বছর ধরে এই রুটিন তিনি একনিষ্ঠভাবে মেনে চলেছিলেন। বৃষ্টি হোক, রোদ হোক — মুয়াজ্জিনের আহ্বান থেমে থাকেনি।
আরো পড়ুন: ভিডিওর জন্য ভয়েস ওভার নিয়ে চিন্তিত? ২০২৬ সালের সেরা ৭টি ফ্রি বাংলা এআই টুল
২০২৪ সালে যেভাবে দেশজুড়ে পরিচিত হলেন
২০২৪ সালের মে মাসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আব্দুর রহমান মোল্লার এই অসাধারণ জীবনযাপনের খবর প্রকাশিত হয়। সংবাদটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এই বৃদ্ধের ঈমানি শক্তি ও অদম্য মনোবলে অভিভূত হয়ে পড়েন।
শতবর্ষী একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের এই নিষ্ঠা কেবল স্থানীয়দের নয়, সারা দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। অনেকে তাঁকে দেখতে বড়দেহা গ্রামেও ছুটে গিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
মৃত্যুতে শোকের ছায়া, জানাজায় জনস্রোত
আব্দুর রহমান মোল্লার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। সোমবার সকালে জানাজায় স্থানীয় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ মরহুমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর শোকবার্তায় বলা হয়েছে —
বড়াইগ্রাম উপজেলার সবচেয়ে প্রবীণ এই মানুষটি অন্ধত্ব জয় করে দ্বীনের পথে যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তা সত্যিই এক বিরল দৃষ্টান্ত।
সংসদ সদস্য আরও জানান, মরহুমের বিদায়ে একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবককে হারাল বড়াইগ্রামবাসী। তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
মরহুম আব্দুর রহমান মোল্লার জীবনের সংক্ষিপ্ত তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | আব্দুর রহমান মোল্লা |
| বয়স | ১২০ বছর |
| গ্রাম | বড়দেহা, নগর ইউনিয়ন, বড়াইগ্রাম, নাটোর |
| দৃষ্টিশক্তি হারান | প্রায় ২২ বছর আগে, দুর্ঘটনায় |
| হজ পালন | দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর বড় ছেলেসহ |
| মসজিদ নির্মাণ | নিজের ৫ শতাংশ জমিতে, মসজিদের নামে রেজিস্ট্রি |
| মৃত্যু | ৫ এপ্রিল ২০২৫, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা |
| দাফন | ৬ এপ্রিল ২০২৫, স্থানীয় কবরস্থান |
আরো পড়ুন: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে ঘিরে বিতর্ক: স্বামী-স্ত্রীর ‘লুটপাট কোম্পানি’ অভিযোগ
একজন মুয়াজ্জিনের যে শিক্ষা রেখে গেলেন 🕌
আব্দুর রহমান মোল্লার জীবন কেবল একটি মানুষের গল্প নয় — এটি ইচ্ছাশক্তি, ঈমান এবং কর্তব্যনিষ্ঠার এক জীবন্ত উদাহরণ। চোখ না থাকলেও পথ থেমে থাকে না — এটাই তিনি প্রমাণ করে গেছেন।
নিজের সম্পদ দিয়ে মসজিদ বানিয়ে সেটি সমাজকে দিয়ে দেওয়া, তারপর নিজেই সেই মসজিদে সেবা করা — এই মানসিকতা আজকের সমাজে বিরল। তাঁর এই নিঃস্বার্থ জীবনযাপন আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
শেষ কথা
আব্দুর রহমান মোল্লা শুধু একজন মুয়াজ্জিন ছিলেন না — তিনি ছিলেন একটি বার্তা। সেই বার্তা হলো, প্রতিবন্ধকতা কখনো সত্যিকারের সংকল্পকে থামাতে পারে না। ১২০ বছরের জীবনে তিনি যা করে গেছেন, তা অনেক সুস্থ-সবল মানুষের পক্ষেও করা সম্ভব হয় না।
তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষকে হারাল। তবে তাঁর স্মৃতি, তাঁর মসজিদ এবং তাঁর দড়ি-বাঁশের সেই পথ — এসব দীর্ঘদিন মানুষের মনে বেঁচে থাকবে।
এই অসাধারণ মানুষটির গল্প যদি আপনাকে অনুপ্রাণিত করে থাকে, তাহলে পোস্টটি শেয়ার করুন। 📌 আমাদের ওয়েবসাইট বুকমার্ক করে রাখুন এবং এ ধরনের অনুপ্রেরণামূলক খবরের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন।
📌 Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত সংবাদ সূত্র ও মরহুমের পরিবারের বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি। মরহুমের বয়স পরিবার-প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে।
যুগের আলো’র সর্বশেষ খবর পেতে Facbook Page অনুসরণ করুন











